ফাইল চিত্র
সাগরদীঘির সেই বিখ্যাত উপনির্বাচন, বেশ কিছু দিন সংবাদের শিরোনামে ছিল। শাসক দল হারল, বিজেপি পিছোল, আর হঠাৎ করে উঠে এল বাম-কংগ্রেস।
দুই বছরের মধ্যে ভোটের এমন উলটপালট কাকতালীয় নয়, এটা মানুষের মনের পরিবর্তন। তারপরের ঘটনা সবার জানা; জয়ী প্রার্থীকেই অপহরণ করে নিয়েছিল প্রতাপশালী শাসক গোষ্ঠী। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারত এর অঙ্গরাজ্যে জনগণের রায় ভুলুন্ঠিত হল।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই উপনির্বাচনে বাম-কংগ্রেস জোট প্রথম স্থান অধিকার করে, শাসক দল দ্বিতীয় স্থানে এবং বিজেপি তৃতীয় স্থানে নেমে যায়। ২০২১ সালের তুলনায় শাসক দলের ভোট প্রায় ১৬% কমে যায়, বিজেপির ভোট কমে প্রায় ১০%, অন্যদিকে বাম-কংগ্রেসের ভোট বেড়ে যায় প্রায় ২৭%। এই পরিবর্তন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছেও বিস্ময়কর ছিল।
এর আগেরবার ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী মাফুজা খাতুন প্রায় ২৪% ভোট পেয়েছিলেন, যা ওই কেন্দ্রে বিজেপির জন্য সর্বোচ্চ। কিন্তু এই কেন্দ্রের জনসংখ্যার বিন্যাসে সংখ্যালঘুর সংখ্যা প্রায় ৬৫%, এবং সংখ্যাগুরু সনাতনী সম্প্রদায় প্রায় ৩৫%।
এরকম আসনে বিজেপি জয়লাভ করবে কেউ দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করবে না।
তাহলে এবার বলুন ৬৫% মুসলমান অধ্যুষিত সাগরদিঘির মতো আসনে বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা না থাকায় প্রায় ৮৯% এর কাছাকাছি হিন্দু অধ্যুষিত সাগরএর মতো আসন গুলিতে বিশেষ নজর দিয়েছে বিজেপি। গঙ্গাসাগর সনাতনীদের হিন্দুদেরএকটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। যেখানে দেশজুড়ে বহু মানুষ প্রতি বছর আসেন ধর্মীয় কারণে,। এই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটও ভোটের রাজনীতিতে একটি প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেকের মত।
গত বিধানসভা নির্বাচনে সাগর কেন্দ্রে বিজেপি ৯৯,১৫৪ ভোট ( ৪১%) ভোট পেয়েছিল, শাসক দল পেয়েছিল প্রায় ৫৪%, এবং সিপিএম পেয়েছিল প্রায় ৪%। এখানে ভোটের ব্যবধান এবং বিভিন্ন দলের প্রাপ্ত ভোট বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, এগারো শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটই জোটবদ্ধ হয়ে শাসকদল এর জয় নিশ্চিত করল।
আর সনাতনীরা সংঘবদ্ধ নয় , তাই ৯০% হওয়ার পরেও জিততে পারলনা। অর্থাৎ, সংখালঘু দের জনগোষ্ঠী, যেখানে ৬৫% সেখানে জিতলো যেখানে ১০% সেখানেও জিতলো। মুসলমানের ঘাড়ে চেপে শাসক মসনদে সওয়ার হল। আর হিন্দু নিশ্চিত করলো দুটাকার চাল, লক্ষ্মীর ভান্ডার। আর নির্বাচনের পরে কিছু হিন্দু মার খেল বাকিরা মুখ বন্ধকরতে বাধ্য হল।
গত পাঁচবছরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়েগেছে। সারা রাজ্যে, শাসকের কীর্তি কাহিনী আরো অনেক প্রকাশ পেয়েছে। শাসক এবার এতটাই চাপএ যে, চলে যাবার শেষ লগ্নে এসে সেতু নির্মাণের কথা ঘোষণা করেছে। গত ১৫ বছরে যা করার কথা মনে হয়নি। কেন এতদিন পরে এই সিদ্ধান্ত, এবং এর বাস্তবায়ন কতটা দ্রুত সম্ভব হবে ? এই প্রসঙ্গে জনগণের মনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সনাতনীদের বোঝার জন্যে এটা একটা সংকেত । সনাতনীরা এবার অনেকটা সংগঠিত হচ্ছে, সেই আশঙ্কা অভিজ্ঞ মুখ্যমন্ত্রী ও করেছেন, যে কারণেই কি এরকম চটজলদি ঘোষণা ?
সব মিলিয়ে, সাগরদীঘি এবং সাগর—এই দুই কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা রাজ্যের বৃহত্তর রাজনৈতিক চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ভোটের অঙ্ক, জনসংখ্যার গঠন, উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি এবং রাজনৈতিক কৌশল—সবকিছু মিলিয়েই নির্ধারিত হয় নির্বাচনের ফলাফল।
শেষ পর্যন্ত, গণতন্ত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্ত। রেড রোডের সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় মঞ্চ থেকে প্রকাশ্যে ওই রকম হুমকির পরে, সনাতনীদের সম্বিৎ ফেরে কিনা, আগামী দিনে পরিবর্তন কোন দিকে এগোয়, সেটাই দেখার বিষয়।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
