গুজরাটের আরব সাগর তীরবর্তী প্রভাস পাটনে অবস্থিত সোমনাথ মন্দির মন্দির হিন্দুধর্মের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে প্রথম এবং সর্বাধিক পবিত্র বলে বিবেচিত। হাজার বছরের ইতিহাস সমৃদ্ধ সোমনাথ মন্দির তার অসীম সম্পদ, মহিমান্বিত স্থাপত্য এবং ধর্মীয় গুরুত্বের জন্য সুপরিচিত ছিল। এই কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহু বিদেশি আক্রমণকারীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল এই মন্দির। ১০২৬ খ্রিস্টাব্দে মাহমুদ গজনীর আক্রমণ ছিল সবচেয়ে কুখ্যাত। পরবর্তীকালে দিল্লি সালতানাতের শাসক এবং মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের আমলেও মন্দিরটি বহুবার ধ্বংস করা হয়। প্রতিবার মন্দিরটি ভেঙে ফেলা হলেও ভক্ত, রাজা এবং সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে পুনরায় এটি নির্মাণ করেছেন। বর্তমান সোমনাথ মন্দিরটি ১৯৫১ সালে সম্পূর্ণ হয় এবং ঐতিহ্যবাহী চালুক্য বা সোলাঙ্কি স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয়। বিখ্যাত সোমপুরা শিল্পী সম্প্রদায় প্রাচীন ভারতীয় মন্দির নির্মাণশৈলী পুনরুজ্জীবিত করে এই মন্দির নির্মাণ করেন।
হিন্দু দর্শনে একটি মন্দিরকে কেবল পাথর বা স্থাপত্যের নির্মাণ হিসেবে দেখা হয় না; তাকে দেবতার জীবন্ত শরীর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরের আধ্যাত্মিক শক্তি বা “প্রাণশক্তি” ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে। কুম্ভাভিষেক সেই শক্তিকে পুনরায় জাগ্রত করে এবং মন্দিরের পবিত্রতা ও দেবত্বকে নবীকরণ করে। দক্ষিণ ভারতের বহু মন্দিরে প্রতি বারো বছরে এই আচার অনুষ্ঠিত হলেও সোমনাথ মন্দিরে এই উচ্চ-শিখর কুম্ভাভিষেক আগে কখনও সম্পন্ন হয়নি। তাই এবারের শিখর কুম্ভাভিষেক স্বাধীন ভারতের সাংস্কৃতিক স্বাভিমানের ৭৫ বছর পূর্তির এক ঐতিহাসিক অধ্যায়।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিজের অনুভব নিজের কলমে প্রকাশ করেছেন।
জয় সোমনাথ !
২০২৬ সালের শুরুতে সোমনাথ স্বাভিমান পর্বে অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সোমনাথ মন্দিরের উপর প্রথম আক্রমণের এক হাজার বছর পরেও এই উৎসব ছিল মন্দিরের চিরন্তন ও অবিনাশী অস্তিত্বের উদযাপন। আর এবার, ১১ মে, আবারও সোমনাথ যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করছি। এবার এই যাত্রা পুনর্নির্মিত সোমনাথ মন্দিরের উদ্বোধনের ৭৫তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে। আমি যেন আবার সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে ফিরে দেখতে চলেছি, যখন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদজি মন্দিরটির উদ্বোধন করেছিলেন। সেই দিন, সোমনাথে ধ্বংস থেকে সৃষ্টির অভিযাত্রা আবারও জীবন্ত হয়ে উঠবে। মাত্র ছয় মাসের মধ্যে সোমনাথের ইতিহাসের এই দুই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী হতে পারা আমার কাছে এক বিরাট সৌভাগ্যের বিষয়।
সোমনাথ কেবলমাত্র একটি মন্দির নয়, এটি আমাদের সভ্যতার অটুট সংকল্পের প্রতীক। এর সামনে উত্তাল বিশাল সমুদ্র যেন অনন্ত কালের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। সমুদ্রের ঢেউ আমাদের শেখায়—ঝড় যতই ভয়ঙ্কর হোক না কেন, মানুষের সাহস ও আত্মবিশ্বাস প্রতিবারই তাকে আবার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তটভূমিতে আছড়ে পড়া ঢেউ যেন ঘোষণা করে চলেছে—মানবিক চেতনাকে দীর্ঘদিন দমন করে রাখা যায় না।
আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রে বলা হয়েছে: “প্রভাসং চ পরিক্রম্য পৃথিবীক্রমসম্ভবম্”—অর্থাৎ, দিব্য প্রভাস (সোমনাথ)-এর পরিক্রমা সমগ্র পৃথিবী পরিক্রমার সমান। যখন মানুষ এখানে দর্শন ও পূজার জন্য আসে, তখন তারা সেই সভ্যতার বিস্ময়কর ধারাবাহিকতারও অনুভব করে, যার আলোকশিখা কখনও নিভে যায়নি। অসংখ্য সাম্রাজ্য এসেছে ও চলে গেছে, সময় বদলেছে, ইতিহাস বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী থেকেছে, তবুও সোমনাথ আমাদের হৃদয়ে অমর হয়ে রয়েছে।
এ সময়টি সেই অসংখ্য মহান ব্যক্তিত্বদের স্মরণ করারও সময়, যারা নিষ্ঠুর আক্রমণকারীদের সামনে অবিচল থেকেছেন। লকুলীশ ও সোম শর্মার মতো মনীষীরা প্রভাসকে শৈব দর্শনের এক মহান কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। চক্রবর্তী মহারাজ ধারসেন চতুর্থ শতাব্দী আগে সেখানে দ্বিতীয় মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। সময়ের কঠিন পরীক্ষার মধ্যেও ভীম প্রথম, জয়পাল ও আনন্দপালের মতো শাসকেরা আক্রমণের বিরুদ্ধে নিজেদের সভ্যতার রক্ষাকবচ হয়ে উঠেছিলেন। মনে করা হয়, মহারাজা ভোজও এই পবিত্র স্থানের পুনর্নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। কর্ণদেব সোলাঙ্কি ও জয়সিংহ সিদ্ধরাজ গুজরাটের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভাব বৃহস্পতি, কুমারপাল সোলাঙ্কি ও পাশুপতাচার্যরা এই তীর্থক্ষেত্রকে আরাধনা ও জ্ঞানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। বিশালদেব বাঘেলা ও ত্রিপুরান্তক এর বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য রক্ষা করেছিলেন। মহিপাল চূড়াসমা ও রাও খঙ্গার চূড়াসমা ধ্বংসের পরে পুনরায় পূজা-পাঠের ঐতিহ্যকে জীবন্ত করেছিলেন। পুন্যশ্লোক অহল্যাবাই হোলকর, যার ৩০০তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত হচ্ছে, তিনি সবচেয়ে কঠিন সময়েও ভক্তির ধারাকে জীবিত রেখেছিলেন। বড়োদার গায়কোয়াড়রা তীর্থযাত্রীদের অধিকার রক্ষা করেছিলেন। একই সঙ্গে, এই ভূমি বীর হামীরজি গোহিল ও বীর বেগড়াজি ভীলের মতো বীরযোদ্ধাদের সাহস ও আত্মত্যাগে ধন্য হয়েছে। তাঁদের বীরত্ব আজও স্মরণ করা হয়।
১৯৪০-এর দশকে স্বাধীনতার চেতনা সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ছিল। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মতো মহান নেতাদের নেতৃত্বে স্বাধীন ভারতের ভিত্তি রচিত হচ্ছিল। সেই সময় একটি বিষয় তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত—সোমনাথের দুরবস্থা। ১৩ নভেম্বর ১৯৪৭ সালে, দীপাবলির সময়, তিনি সোমনাথের জীর্ণ ধ্বংসাবশেষের সামনে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের জল হাতে নিয়ে সংকল্প করেছিলেন—“এই (গুজরাটি) নববর্ষে আমাদের অঙ্গীকার, সোমনাথের পুনর্নির্মাণ হবে। সৌরাষ্ট্রের মানুষকে এর জন্য সর্বতোভাবে অবদান রাখতে হবে। এটি এক পবিত্র কাজ, যেখানে সকলের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।” তাঁর এই আহ্বান শুধু গুজরাট নয়, সমগ্র ভারতবর্ষকে নতুন উদ্দীপনায় ভরিয়ে দিয়েছিল।
দুর্ভাগ্যবশত, সর্দার প্যাটেল তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে দেখে যেতে পারেননি। পুনর্নির্মাণের পর সোমনাথ মন্দির ভক্তদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার আগেই তিনি পরলোকগমন করেন। তবুও, প্রভাস পাটনের পবিত্র ভূমিতে তাঁর প্রভাব সর্বদা অনুভূত হয়েছে। তাঁর স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন কে. এম. মুনশি, যিনি নওয়ানগরের জামসাহেবের সমর্থন পেয়েছিলেন। ১৯৫১ সালে মন্দিরের পুনর্নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদকে উদ্বোধনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর আপত্তি সত্ত্বেও, ডঃ প্রসাদ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে তাকে ঐতিহাসিক করে তুলেছিলেন।
২০০১ সালের অক্টোবর মাসের সেই সময়টি আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে, যখন আমি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম। ৩১ অক্টোবর ২০০১ সালে, সর্দার প্যাটেলের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে গুজরাট সরকার সোমনাথ মন্দিরের পুনর্নির্মাণের ৫০তম বর্ষপূর্তি জাঁকজমকভাবে উদযাপন করেছিল। একই সময়ে সর্দার প্যাটেলের ১২৫তম জন্মজয়ন্তীও পালিত হচ্ছিল। সেই অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীজি এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবাণীজির উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলেছিল।
১৯৫১ সালের ১১ মে তাঁর ভাষণে ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ বলেছিলেন, সোমনাথ মন্দির বিশ্বকে এই বার্তা দেয় যে, অনন্য শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসকে কখনও ধ্বংস করা যায় না। তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, এই মন্দির সর্বদা মানুষের হৃদয়ে বিরাজ করবে। তিনি আরও বলেছিলেন, মন্দিরের পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে সর্দার প্যাটেলের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। পাশাপাশি, সর্দার প্যাটেলের ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি আনার ওপরও তিনি জোর দিয়েছিলেন। তাঁর এই বার্তাগুলি আজও অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক।
গত এক দশক ধরে আমরা সেই পথেই এগিয়ে চলেছি। “উন্নয়নও, ঐতিহ্যও”—এই মন্ত্রে অনুপ্রাণিত হয়ে সোমনাথ থেকে কাশি, কামাখ্যা থেকে কেদারনাথ, অযোধ্যা থেকে উজ্জয়িনী এবং ত্র্যম্বকেশ্বর থেকে শ্রীশৈলম পর্যন্ত আমরা আমাদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলিকে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন করে তুলেছি। একই সঙ্গে তাদের ঐতিহ্যগত পরিচয়ও অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে আজ আরও বেশি মানুষ এখানে আসতে পারছেন। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে, জীবিকা সুরক্ষিত হচ্ছে এবং “এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত”-এর চেতনা আরও সুদৃঢ় হচ্ছে।
সোমনাথের রক্ষা ও পুনর্নির্মাণের জন্য যারা নিজেদের সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদের সংগ্রাম আমরা কখনও ভুলতে পারি না। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মানুষ এই মন্দিরের গৌরব ও ঐশ্বর্য ফিরিয়ে আনতে অসাধারণ অবদান রেখেছিলেন। তাঁদের সেই আস্থা সমগ্র ভারতবর্ষের প্রতিও ছিল। তাঁরা এমন এক ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন, যাকে ভৌগোলিক সীমারেখায় ভাগ করা যায় না। আজকের বিভক্ত পৃথিবীতে সোমনাথের এই ঐক্যের শিক্ষা আগের চেয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। সোমনাথ তার গৌরবময় ঐতিহ্য নিয়ে চিরকাল অটুট থাকবে, কারণ এটি আমাদের সম্মিলিত সভ্যতার প্রতীক। এই গৌরবকে প্রণাম জানিয়ে, আত্মবলিদানকারী বীরদের স্মরণে এবং দানবীরদের উদারতাকে সম্মান জানিয়ে আগামী এক হাজার দিন এখানে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হবে। দেখে অত্যন্ত আনন্দ হচ্ছে যে, বিপুল সংখ্যক মানুষ এই পবিত্র উদ্যোগে অংশগ্রহণ করছেন।
সোমনাথ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যখন কোনও সমাজ তার আস্থা, সংস্কৃতি ও ঐক্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন তাকে দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখা যায় না। আজও আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি এই সম্মিলিত চেতনা, এই একাত্মতার অনুভূতি। এই ভাবনাই আমাদের বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে এগিয়ে চলার প্রেরণা দেয়।
আমি সমস্ত দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানাই, এই পবিত্র উপলক্ষে পুণ্যভূমি সোমনাথ ধামের দর্শনে আসুন এবং এর মহিমা প্রত্যক্ষ করুন। যখন আপনি সোমনাথের সমুদ্রতটে দাঁড়াবেন, তখন তার প্রাচীন প্রতিধ্বনি নিজের অন্তরে অনুভব করবেন। সেখানে আপনি শুধু ভক্তির অনুভূতিই পাবেন না, বরং সেই সভ্যতাগত চেতনার শক্তিশালী স্পন্দনও অনুভব করবেন, যা কখনও থেমে যায়নি, যার তীব্রতা কখনও কমেনি। সেখানে আপনি ভারতের সেই অপরাজেয় আত্মার অনুভব করবেন, যা অসংখ্য আঘাতের পরেও নিজের পরিচয় ও সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেছে। আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন, এত প্রচেষ্টার পরেও কেন আমাদের সভ্যতাকে মুছে ফেলা যায়নি। সেখানে আপনি সেই চিরবিজয়ের দর্শন অনুভব করবেন, যা যুগ যুগ ধরে ভারতের শক্তির উৎস হয়ে রয়েছে। আমার পূর্ণ বিশ্বাস, এটি আপনার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।
জয় সোমনাথ।
(নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং শ্রী সোমনাথ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান।)
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
