Site icon Jist Feed

সমুদ্রপথে নতুন মৈত্রী: ভারত-জাপান সামরিক সন্ধি সাক্ষর, একজোট হয়ে যুদ্ধজাহাজ তৈরির পথে দুই দেশ

Indo Japan Maritime Deal

চিন, উত্তর কোরিয়া আর অনিশ্চিত আমেরিকার ছায়ায় নয়াদিল্লির কাছাকাছি টোকিও; ‘ছোট বোন’ সম্বোধনের দেড় মাসের মাথায় এবার সমুদ্রে হাত মেলাল দুই দেশ

নয়াদিল্লি, ২২ অগস্ট, ২০২৬: গত বৃহস্পতিবার, ২০ অগস্ট, নয়াদিল্লিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কইজুমির মধ্যে বৈঠকের পরে সাক্ষরিত হল একটি স্মারক-চুক্তি Memorandum of Arrangement on Maritime Security Cooperation। নয়াদিল্লির মানেকশ’ সেন্টারে সাম্মানিক অভ্যর্থনার পরে দুই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর হাত মেলানোর ছবিই বলে দিচ্ছে, ভারত ও জাপানের কৌশলগত সম্পর্ক এখন নিছক কূটনৈতিক সৌজন্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছে। তথ্য আদান-প্রদান থেকে যৌথ মহড়া, বন্দর ব্যবহার থেকে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের সম্ভাবনা যাচাই সব ক্ষেত্রেই এবার একসঙ্গে পথ চলার কথা বলল দুই দেশ।

বিষয়টি নিছক একটি সরকারি নথিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, এই সমঝোতা ভারতীয় নৌবাহিনী ও জাপান মেরিটাইম সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সের (JMSDF) মধ্যে সহযোগিতাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় বেঁধে ফেলল। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে এক জটিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যেখানে আমেরিকার নিরাপত্তা-ছাতার উপর ভরসা নিয়ে জাপানের মনে প্রশ্ন জাগছে, উত্তর কোরিয়া প্রায় প্রতি মাসে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করছে, আর চিনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা গোটা এশিয়াকে ভাবাচ্ছে।

চুক্তিতে ঠিক কী কী রয়েছে

যৌথ বিবৃতিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই সমঝোতার আওতা বেশ বিস্তৃত। নীচের সারণিতে তার মূল দিকগুলি দেখে নেওয়া যাক –

ক্ষেত্রকী থাকছে
তথ্য আদান-প্রদানমেরিটাইম ডোমেন অ্যাওয়ারনেস (MDA) সংক্রান্ত তথ্য ভাগ করে নেওয়া, জাহাজের গতিবিধি নিয়ে নজরদারি
উদ্ধার ও ত্রাণসার্চ অ্যান্ড রেসকিউ (SAR) এবং মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ত্রাণ (HADR)-এ পারস্পরিক সহযোগিতা
নৌ মহড়া ও সফরযৌথ মহড়া, নৌবাহিনীর পারস্পরিক বন্দর সফর, কর্মী বিনিময়, বিশেষ বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি
লজিস্টিকএকে অপরের বন্দর ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ, জাহাজ মেরামতের পারস্পরিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা
জাহাজ নির্মাণযৌথ নকশা ও শিপবিল্ডিংয়ের সম্ভাবনা যাচাই, মেক ইন ইন্ডিয়ার আওতায় ভারতীয় শিপইয়ার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধি
প্রযুক্তি হস্তান্তরইউনিকর্ন (UNICORN) সংহত অ্যান্টেনা ব্যবস্থা দুই দেশের প্রথম প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম হস্তান্তর প্রকল্প
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোডিরেক্টর জেনারেল/জয়েন্ট সেক্রেটারি স্তরের নতুন ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন

এর পাশাপাশি দু’দেশের সেনাবাহিনী পর্যায়ের মহড়া ‘ধর্ম গার্ডিয়ান’ এবং নৌ-মহড়া ‘জাইমেক্স’ চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ঘোষণা এই বছরই অনুষ্ঠিত হতে চলা বিমানবাহিনীর মহড়া ‘বীর গার্ডিয়ান ২৬’-এ প্রথমবার জাপানি যুদ্ধবিমান ভারতে আসবে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, স্থলবাহিনী বা নৌবাহিনীর তুলনায় বিমানবাহিনীর যৌথ মহড়ায় প্রযুক্তিগত ও পরিচালনগত সমন্বয় অনেক বেশি জটিল হয় তাই এই পদক্ষেপের গুরুত্ব আলাদা।

প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত: স্টার্টআপরাও ডাক পেল

রাজনাথ সিংহের সঙ্গে বৈঠক সেরে সেদিনই কইজুমি সৌজন্য সাক্ষাতে যান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, মোদী সেখানে গত জুলাইয়ে টাকাইচির সঙ্গে তাঁর বিস্তারিত আলোচনার কথা স্মরণ করেন এবং দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ধারাবাহিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন। ইন্দো-প্যাসিফিক তথা তার বাইরেও শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির স্বার্থে এই সহযোগিতার গুরুত্ব কতটা তা-ও স্পষ্ট করে দেন তিনি। পরে নিজের সমাজমাধ্যম পোস্টে মোদী লেখেন, জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর “চমৎকার আলোচনা” হয়েছে, আর দুই দেশের বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব ইন্দো-প্যাসিফিকের শান্তি ও সমৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

তবে এই বৈঠকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি অন্য জায়গায়। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, মেক ইন ইন্ডিয়ার আওতায় সহ-উন্নয়ন ও সহ-উৎপাদনের ক্ষেত্রে জাপানি সংস্থাগুলি শুধু ভারতের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থার সঙ্গেই নয়, ভারতীয় স্টার্টআপগুলির সঙ্গেও হাত মেলাতে পারে। জবাবে কইজুমি প্রধানমন্ত্রীকে জানান, আলোচনাকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তরিত করতে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই স্টার্টআপ-প্রসঙ্গ নিছক কথার কথা নয়। বড় সরকারি শিপইয়ার্ড বা প্রতিষ্ঠিত প্রতিরক্ষা সংস্থার পাশাপাশি ছোট, ক্ষিপ্র প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকেও এই বাস্তুতন্ত্রে টেনে আনা গেলে সেন্সর, সফটওয়্যার, ড্রোন বা ইলেকট্রনিক-যুদ্ধ ব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রে উদ্ভাবনের গতি বাড়তে পারে যা কেবল বড় সংস্থার একার পক্ষে ধরে রাখা কঠিন।

দেড় মাস আগের সেই ‘ছোট বোন’ সম্বোধন

এই সামুদ্রিক সমঝোতা আকাশ থেকে পড়েনি। এর ভিত তৈরি হয়েছিল গত জুলাই মাসে। ১ থেকে ৩ জুলাই জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে টাকাইচি তিন দিনের সফরে ভারতে আসেন ক্ষমতায় বসার পরে তাঁর প্রথম ভারত সফর, এবং ১৬তম ভারত-জাপান বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন। হায়দরাবাদ হাউসে বৈঠকের পরে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী টাকাইচিকে সম্বোধন করেন ‘মেরি ছোটি বহেন’ বলে অর্থাৎ, আমার ছোট বোন। জবাবে টাকাইচিও মোদীকে ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করে দুই দেশকে ‘ভাই-বোনের মতো’ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। জাপানের রাষ্ট্রদূত কেইচি ওনো পরবর্তীতে বলেছিলেন, এই মুহূর্তটি দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা ও আস্থার একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ।

সৌজন্যের আড়ালে সেই সফরে বেশ কিছু বড় পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছিল। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে পাঁচটি অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয় সেমিকন্ডাক্টর ও বিরল খনিজ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি (যেমন অ্যামোনিয়া), তথ্যপ্রযুক্তি পরিকাঠামো ও সাবমেরিন কেবল, এবং ওষুধশিল্প। জাপান ভারতে ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন (আনুমানিক ৬৩০০ কোটি ডলার) বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে। আর প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সেই সফরেই প্রথমবার সাক্ষরিত হয় ইউনিকর্ন ব্যবস্থা নিয়ে নীতিগত সমঝোতা যাকে পরবর্তীতে দুই দেশের ‘প্রথম প্রতিরক্ষা সহ-উন্নয়ন চুক্তি’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার জুলাইয়ের ওই শীর্ষ সম্মেলনে জাপানের মোগামি-শ্রেণির স্টিলথ ফ্রিগেট ভারতে তৈরির জল্পনা সরকারিভাবে আলোচ্যসূচিতে ছিল না। বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রি সাংবাদিকদের স্পষ্ট করে জানান, এই বিষয়টি সেদিনের বৈঠকের অংশ ছিল না, যদিও ভবিষ্যতে এমন সহযোগিতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি তিনি।

এত অল্প সময়ে ভারত ও জাপানের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এতটা এগিয়ে যাওয়ার পিছনে একাধিক কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা :

প্রথমত, আমেরিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ইরানকে ঘিরে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সামরিক অভিযান এবং হরমুজ প্রণালীতে সৃষ্ট সঙ্কট বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বিপুল অস্থিরতা তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার ভাষায়, এটি বিশ্ব তেল বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ-বিপর্যয়গুলির একটি। এই সঙ্কট আমেরিকার সামরিক মনোযোগ ও সম্পদের একটা বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছে। জাপানের নীতিনির্ধারকদের একাংশের মতে, এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে প্রয়োজনের মুহূর্তে আমেরিকার কৌশলগত অগ্রাধিকার কতটা দ্রুত বদলে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, উত্তর কোরিয়ার লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা। ২০২৬ সালে জানুয়ারি থেকে অগস্ট পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া একাধিকবার জাপান সাগরের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার হিসেব অনুযায়ী, চলতি বছরে অন্তত ১১ বার। জাপান যখন আমেরিকার তৈরি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়, তখন কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং জাপানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রয়োজনে অতিরিক্ত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। উত্তর কোরিয়া জাপানের প্রতিরক্ষা বৃদ্ধির সমালোচনা করে একাধিকবার বিবৃতিও দিয়েছে।

তৃতীয়ত, চিনের সঙ্গে জটিল ইতিহাস ও বর্তমান উত্তেজনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সাম্রাজ্যের কার্যকলাপ চিনে যে ক্ষত তৈরি করেছিল, তা আজও দুই দেশের সম্পর্কের উপর ছায়া ফেলে। বর্তমানে পূর্ব চিন সাগরে চিনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা, এবং তাইওয়ান নিয়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনা বিশেষত তাইওয়ানে হামলা জাপানের অস্তিত্বের পক্ষেই বিপজ্জনক হতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রী টাকাইচির একটি মন্তব্য ঘিরে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক টানাপড়েন জাপানের নিরাপত্তা-ভাবনাকে নতুন করে উস্কে দিয়েছে।

চতুর্থত, জাপানের নিজস্ব জনসংখ্যা সঙ্কট। ২০২৫ সালের জনগণনা অনুযায়ী জাপানের জনসংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি ৩০ লক্ষে ২০২০ সালের তুলনায় ৩০ লক্ষ কম, যা রেকর্ড পরিমাণ পতন। জন্মহার নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন ১.১৪-তে; ২০২৫ সালে জন্মের সংখ্যা ছিল মাত্র ৭ লক্ষ ৫ হাজার ৮০৯ টানা দশম বছরের পতন, আর মৃত্যুর সংখ্যা জন্মের চেয়ে ৯ লক্ষেরও বেশি বেশি। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়ছে জাপানের সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সের নিয়োগেও। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই জাপানের ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্রে ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ, শুধু প্রযুক্তি থাকলেই হবে না, তা চালানোর মতো পর্যাপ্ত জনবলও দরকার, যা জাপানের ভাঁড়ারে ক্রমশ কমছে।

এই চারটি কারণ মিলিয়েই জাপান বুঝতে পারছে, একা আমেরিকার উপর নির্ভর করে থাকাটা আর নিরাপদ কৌশল নয়। আর এই শূন্যস্থান পূরণে ভারতের মতো একটি বিশাল, দক্ষ মানবসম্পদ-সমৃদ্ধ দেশকে পাশে চাওয়াটাই স্বাভাবিক।

জাপান বনাম ভারত: কার ভাঁড়ারে কী শক্তি

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ও জাপানের এই অংশীদারিত্বের মূল আকর্ষণ হল দুই দেশের শক্তি একে অপরের দুর্বলতা পূরণ করে।

জাপানের শক্তিভারতের শক্তি
উচ্চ-প্রযুক্তি প্রিসিশন ইঞ্জিনিয়ারিং ও স্টিলথ ডিজাইনবিপুল দক্ষ প্রকৌশলী ও শ্রমশক্তি
উন্নত সেন্সর, ইলেকট্রনিক্স, কমিউনিকেশন প্রযুক্তিবৃহৎ উৎপাদন পরিকাঠামো (Manufacturing Ecosystem)
দীর্ঘদিনের শিপবিল্ডিং অভিজ্ঞতা (যেমন মোগামি-শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ)ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা শিল্প-বাস্তুতন্ত্র ও শিপইয়ার্ড সক্ষমতা
রোবোটিক্স, উপগ্রহ-নির্ভর নজরদারি, অত্যাধুনিক উপকরণকম উৎপাদন খরচ, বৃহৎ বাজার
মূলধন ও গবেষণা-উন্নয়নে বিনিয়োগ ক্ষমতামেক ইন ইন্ডিয়া ও আত্মনির্ভর ভারত নীতির প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন

এশিয়া টাইমস-এর একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জাপানের কৌশল আসলে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয় বরং একাধিক উৎস থেকে প্রযুক্তি ও উৎপাদন-সহযোগিতা তৈরি করে ঝুঁকি কমানো। জাপান কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিংয়ে আমেরিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকবে বটে, কিন্তু প্রতিরক্ষা উৎপাদনে একচেটিয়া নির্ভরতা কমানোর চেষ্টাও চালিয়ে যাবে।

ভারতের হাতিয়ার: পাঁচ প্রধান শিপইয়ার্ড কতটা প্রস্তুত ?

জাপানের প্রযুক্তি ও ভারতের উৎপাদন সক্ষমতার মেলবন্ধনের কথা বলা সহজ, বাস্তবে তা কতটা সম্ভব তা নির্ভর করছে ভারতের শিপইয়ার্ডগুলির প্রস্তুতির উপর। আর সেই ছবিটা বেশ আশাব্যঞ্জক বলেই মনে করছেন শিল্পবিশ্লেষকরা। ভারতের প্রধান পাঁচটি প্রতিরক্ষা শিপইয়ার্ড মুম্বইয়ের মাজগাঁও ডক শিপবিল্ডার্স, কোচির কোচিন শিপইয়ার্ড, কলকাতার গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (জিআরএসই), গোয়ার গোয়া শিপইয়ার্ড এবং বিশাখাপত্তনমের হিন্দুস্তান শিপইয়ার্ড বর্তমানে এক নজিরবিহীন সম্প্রসারণ পর্বের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।

শিপইয়ার্ডঅবস্থানবর্তমান শক্তি
মাজগাঁও ডক শিপবিল্ডার্স (MDL)মুম্বইডুবোজাহাজ ও ডেস্ট্রয়ার নির্মাণে ভারতের শীর্ষ শিপইয়ার্ড; এ পর্যন্ত ৩১টি যুদ্ধজাহাজ ও ৮টি ডুবোজাহাজ সরবরাহ; এখন বাণিজ্যিক ও রফতানি বাজারেও সম্প্রসারণ শুরু করেছে
কোচিন শিপইয়ার্ড (CSL)কোচিড্রাই ডক ক্ষমতায় ভারতের বৃহত্তম সরকারি শিপইয়ার্ড; দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি প্রথম বিমানবাহী রণতরী আইএনএস বিক্রান্তের নির্মাতা; এখন ডেস্ট্রয়ার, এলপিডি ও এলএনজি বাহক জাহাজেও বৈচিত্র্য আনছে
গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স (GRSE)কলকাতাফ্রিগেট, করভেট, অত্যাধুনিক অফশোর টহল জাহাজ নির্মাণে ভারতের দ্রুততম বর্ধনশীল রাষ্ট্রায়ত্ত শিপইয়ার্ড; জার্মানিতে রফতানি-অর্ডারও চলছে
গোয়া শিপইয়ার্ড (GSL)গোয়া২০২৬-এর গোড়ায় ‘শিডিউল এ’ মর্যাদা পাওয়া সংস্থা; অফশোর টহল জাহাজ ও ক্ষেপণাস্ত্রবাহী জাহাজ নির্মাণে দক্ষ; এশিয়া-আফ্রিকার বন্ধু দেশগুলিতেও রফতানি করে
হিন্দুস্তান শিপইয়ার্ড (HSL)বিশাখাপত্তনমডুবোজাহাজ ও ফ্রিগেট নির্মাণে বিশেষজ্ঞ; প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের নতুন মূলধন সহায়তায় সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে

সরকারি হিসেব বলছে, আগামী পাঁচ বছরে ডুবোজাহাজ, ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট ও কোস্ট গার্ড জাহাজ মিলিয়ে প্রতিরক্ষা শিপবিল্ডিং খাতে বরাদ্দ থাকছে প্রায় ১ লক্ষ ৫২ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথ মন্ত্রকের ঘোষিত প্রায় ৪৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকার নতুন শিপবিল্ডিং সহায়তা প্রকল্প। শিল্পমহলের একাংশের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সাল থেকে গড়ে প্রতি ৪০-৪২ দিনে একটি করে নতুন যুদ্ধজাহাজ নৌবাহিনীতে যুক্ত হতে পারে অর্থাৎ ভারতের নৌ-নির্মাণ শিল্প একরকম ‘সুপার-সাইকেলে’ প্রবেশ করছে বলেই মত বিশ্লেষকদের। সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য স্পষ্ট বিশ্বের ১৬তম বৃহৎ জাহাজ নির্মাতা দেশ থেকে ভারতকে ক্রমশ শীর্ষ পাঁচে তুলে আনা।

এই প্রেক্ষাপটে ভারত-জাপান সহযোগিতার তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাপানের নকশা, সেন্সর ও প্রিসিশন প্রযুক্তি যদি এই পাঁচটি শিপইয়ার্ডের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন-সক্ষমতার সঙ্গে সত্যিই যুক্ত হতে পারে, তাহলে তা নিছক প্রতীকী অংশীদারিত্বের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব শিল্প-রূপান্তরের চেহারা নিতে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

ইউনিকর্ন: ছোট পদক্ষেপ, বড় বার্তা

এই গোটা সহযোগিতার সবচেয়ে বাস্তব উদাহরণ এখন ইউনিকর্ন (UNICORN) প্রকল্প জাহাজে বসানো একটি সংহত যোগাযোগ অ্যান্টেনা ব্যবস্থা, যা মূলত জাপানি সংস্থা এনইসি (NEC)-র তৈরি। এতে যোগাযোগ, নজরদারি ও ইলেকট্রনিক-যুদ্ধ সংক্রান্ত একাধিক কার্যক্ষমতা একটিমাত্র মাস্তুল-সদৃশ কাঠামোয় সংহত করা থাকে, যা যুদ্ধজাহাজের রাডার-প্রতিফলন অনেকটাই কমিয়ে দেয়। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ভাষায় এ ধরনের প্রযুক্তিকে বলা হয় ‘নিনজা টেক’।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ব্যবস্থা ভারতে তৈরি হবে ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড (BEL)-এর হাতে জাপান নকশা ও মূল প্রযুক্তি দেবে, উৎপাদন ও সংযোজন হবে ভারতেই। এটিকেই দুই দেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম হস্তান্তর প্রকল্প বলা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ‘পাইলট প্রজেক্ট’-এর গুরুত্ব প্রকল্পের আকারে নয়, বরং তার মডেলে ভবিষ্যতে ড্রোন, রোবোটিক্স, ইলেকট্রনিক-যুদ্ধ সরঞ্জাম বা সেন্সর ব্যবস্থার মতো আরও জটিল প্রকল্পে এগোনোর আগে দুই দেশের সক্ষমতা ও সমন্বয় ঝালিয়ে নেওয়ার একটি মঞ্চ হিসেবে এটি কাজ করবে।

যুদ্ধজাহাজ কি সত্যিই একসঙ্গে তৈরি হবে ?

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে একাধিক সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়ায় জাপান নাকি ভারতকে তার অত্যাধুনিক মোগামি-শ্রেণির (আপগ্রেডেড সংস্করণ, যা ‘নিউ এফএফএম’ নামেও পরিচিত) স্টিলথ ফ্রিগেট মেক ইন ইন্ডিয়ার আওতায় যৌথভাবে তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। প্রায় ৯০ জন ক্রু নিয়ে চলতে সক্ষম, উচ্চমাত্রায় স্বয়ংক্রিয় এই যুদ্ধজাহাজের দাম প্রতিটি প্রায় ৫০ কোটি ডলার। জাপান একই ধরনের একটি চুক্তি এপ্রিলেই অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও সেরে ফেলেছে।

তবে খেয়াল রাখা দরকার এই প্রস্তাব এখনও আনুষ্ঠানিক চুক্তির রূপ নেয়নি। জুলাইয়ের শীর্ষ সম্মেলনে এই বিষয়টি নিয়ে সরকারিভাবে কোনও আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন বিদেশসচিব নিজেই। অগস্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও যৌথ নকশা ও শিপবিল্ডিং নিয়ে কথা এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু নির্দিষ্ট করে মোগামি-শ্রেণির জাহাজের কথা যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ নেই। তাই একে এখনই ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ না বলে বরং ‘আলোচনাধীন সম্ভাবনা’ বলাই সংগত। বিশ্লেষকদের একাংশ অবশ্য মনে করছেন, ইউনিকর্নের মতো ছোট প্রকল্প সফল হলে, বড় জাহাজ নির্মাণের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট।

ইন্দো-প্যাসিফিকের বৃহত্তর ছক

এই সহযোগিতাকে শুধু দ্বিপাক্ষিক প্রেক্ষাপটে দেখলে ভুল হবে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আন্দামান সাগরে ভারত, জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে প্রথমবার ত্রিপাক্ষিক নৌ-মহড়া (PASSEX) অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই মাসে বিশাখাপত্তনমে আয়োজিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নৌবহর পর্যালোচনা ২০২৬, ৭৪টি দেশের নৌবাহিনীর অংশগ্রহণে যা স্বাধীনতার পর ভারতের আয়োজিত সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক নৌ-সমাবেশ। ভারত ১৬ বছর পরে ফিরে পেয়েছে ইন্দিয়ান ওশন নেভাল সিম্পোজিয়ামের সভাপতিত্বও।

জাপান ও ভারত উভয়েই একটি ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ (Free and Open Indo-Pacific)-এর ধারণায় বিশ্বাসী। দুই দেশ যৌথ বিবৃতিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টিকারী যে কোনও একতরফা পদক্ষেপ এবং বলপ্রয়োগ বা জবরদস্তির মাধ্যমে স্থিতাবস্থা বদলের চেষ্টার বিরোধিতা করেছে নাম না করেই বার্তাটি কার উদ্দেশে, তা বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না কারও। কোয়াডভুক্ত দেশ (ভারত, জাপান, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া) হিসেবে এই বার্তার একটি বৃহত্তর তাৎপর্যও রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে পারস্পরিক সহায়তার জন্য ‘ইন্দো-প্যাসিফিক লজিস্টিক নেটওয়ার্ক’ নিয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে দুই দেশ।

বিশেষজ্ঞের মত

শিলং-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এশিয়ান কনফ্লুয়েন্সের ফেলো এবং ইন্দো-প্যাসিফিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কে ইওহোমের পর্যবেক্ষণ, ভারত-জাপান সম্পর্ক অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বরাবরই মজবুত থাকলেও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতি ছিল তুলনায় ধীর মূলত জাপানের নিজস্ব সাংবিধানিক ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে, ভারতের দিক থেকে তেমন কোনও বাধা কখনওই ছিল না বলে তাঁর মত। চলতি বছরের এপ্রিলে টোকিও প্রতিরক্ষা-সরঞ্জাম রফতানি সংক্রান্ত পুরনো বিধিনিষেধ শিথিল করার পর থেকেই ছবিটা বদলাতে শুরু করেছে বলে তিনি মনে করেন।

তাঁর মতে, চিন ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠায় প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমেরিকার বর্তমান প্রশাসনের আমলে ওয়াশিংটনকে একচেটিয়া নিরাপত্তা জোগানদার হিসেবে দেখার আস্থাতেও ভাটার পড়া। এই শূন্যস্থান পূরণের দায়িত্ব ক্রমশ বর্তাচ্ছে আঞ্চলিক মাঝারি শক্তিগুলির উপরেই আর সেখানেই ভারত-জাপান প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের প্রকৃত তাৎপর্য, এমনটাই মনে করছেন তিনি। তবে তাঁর স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, এই সম্পর্ক কোনও প্রথাগত সামরিক জোটে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা নিকট ভবিষ্যতে নেই বরং দুই কৌশলগতভাবে স্বাধীন শক্তির নিজ নিজ সামর্থ্য জুড়ে দেওয়ার একটি চেষ্টা এটি।

যুদ্ধ নয়, দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরির লড়াই

এত কিছুর পরে স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে তবে কি ভারত সত্যিই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ? প্রতিরক্ষা মহলের বেশিরভাগ পর্যবেক্ষকের মতে, বিষয়টিকে এত সংকীর্ণভাবে দেখাটা ভুল হবে। বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি শিল্প-সক্ষমতা তৈরির কৌশল গবেষণা থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রযুক্তি হস্তান্তর থেকে যৌথ উন্নয়ন, যৌথ উন্নয়ন থেকে যৌথ উৎপাদন, এবং শেষে দেশীয় উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এই ধাপগুলি পেরিয়েই প্রকৃত সুফল মিলবে, যাতে সময় লাগবে বছর সাতেক থেকে দশেক, কখনও তারও বেশি। অর্থাৎ, আজকের এই চুক্তিগুলির আসল ফলাফল হয়তো স্পষ্ট হয়ে উঠবে ২০৩২-৩৫ সালের মধ্যে। আর ভারতের লক্ষ্য যে কেবল আগামী দু’-চার বছর নয়, তা বোঝা যায় সরকারি মহলের ‘বিকশিত ভারত @২০৪৭’ ভাবনাতেই স্বাধীনতার শতবর্ষে এমন একটি ভারত গড়ে তোলার লক্ষ্য, যে নিজের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নিজেই তৈরি করতে পারবে, প্রয়োজনে অন্য দেশকেও সরবরাহ করতে পারবে।

ভারত ও জাপানের এই সামুদ্রিক নিরাপত্তা সমঝোতা তাই কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় জুলাইয়ের ‘ছোট বোন’ মুহূর্ত থেকে শুরু করে অগস্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৈঠক পর্যন্ত একটি ধারাবাহিক কূটনৈতিক যাত্রার সাম্প্রতিকতম অধ্যায় এটি। ইউনিকর্নের মতো ছোট প্রকল্প দিয়ে শুরু হলেও, এর গন্তব্য অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে যদি দুই দেশ সত্যিই তাদের পরিপূরক শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে। আপাতত নয়াদিল্লি ও টোকিও উভয়েই বলছে, এ বছরের মধ্যেই টোকিওতে চতুর্থ ভারত-জাপান ‘২+২’ বৈদেশিক ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা তরান্বিত করা হবে যদিও নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনও ঘোষণা হয়নি।

Exit mobile version