Site icon Jist Feed

কামারশালা থেকে শিল্প ক্লাস্টার: পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুর সার্জিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির উত্থান ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

Surgical Industry

কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুর সার্জিক্যাল ক্লাস্টার ভারতের অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) কেন্দ্রগুলির মধ্যে একটি, যা সার্জিক্যাল ও চিকিৎসা যন্ত্র উৎপাদনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। ১৯৩০-এর দশকে ঐতিহ্যবাহী কর্মকার সম্প্রদায়ের হাত ধরে শুরু হওয়া এই শিল্প বর্তমানে ৩২,০০০-এরও বেশি প্রকারের যন্ত্র উৎপাদনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ MSME ভিত্তিক শিল্প কেন্দ্র, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করছে। ঐতিহ্যগত শক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, ব্র্যান্ডিং সমস্যা, আর্থিক প্রতিবন্ধকতা এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রক জটিলতা এই শিল্পের অগ্রগতিকে প্রভাবিত করছে। উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে আঞ্চলিক শিল্প ক্লাস্টারগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রাথমিক সূচনা (১৯৩০–৪০ দশক)

বারুইপুর সার্জিক্যাল শিল্পের সূচনা আজথেকে প্রায় ৯০ বছর আগে ১৯৩৭ সাল নাগাদ, যখন স্থানীয় হিন্দু কর্মকার সম্প্রদায় তাদের ধাতব কাজের দক্ষতা ব্যবহার করে সার্জিক্যাল যন্ত্র তৈরি শুরু করেন। এই শিল্পের পথিকৃৎ ছিলেন পবন কর্মকার, গৌর কর্মকার এবং নিতাই কর্মকার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। এনাদের কাছে সুবর্ণ সুযোগ আসে । স্থানীয় উৎপাদনের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। এর পর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। শিল্পটি দ্রুত বিকশিত হয়।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময় (১৯৪৭–৬০ দশক)

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর সার্জিক্যাল শিল্পের ভৌগোলিক পরিবর্তন ঘটে। স্বাধীনতার আগে সিয়ালকোট ছিল এই শিল্পের প্রধান কেন্দ্র। সিয়ালকোট পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির পরে দেশীয় সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে বারুইপুর পূর্ব ভারতে আত্মপ্রকাশ করে।

এর পরে, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান চন্দ্র রায় এই শিল্পের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬০-এর দশকে পিয়ালি টাউনে সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট সার্ভিস স্টেশন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ছোট শিল্প ইউনিটগুলিকে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করার লক্ষ্যে কাজ করতে থাকে ।

শিল্পের বিকাশ (১৯৭০–৮০ দশক)

1970 এবং 1980 এর দশকের মধ্যে সময়কাল কারিগর-ভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে কাঠামোগত MSME কাঠামোয় রূপান্তরিত হয়। নতুন যুবক উদ্যোগপতিরা এগিয়ে আসে। এই সময়ে বেশ কয়েকটি মূল সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যার মধ্যে রয়েছে:

Baruipur Surgical Instrument Company (1975)
Indo Webal Surgical Pvt. Ltd. (1976)
Chatterjee Surgical (1980)
M.S. Kanji Surgical Pvt. Ltd.
Universal Surgical India

পরবর্তীকালে এই ফার্মগুলির সক্রিয় সহযোগিতায় বারুইপুরের এই ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাস্টার এর রূপ ধারণ করে। এই ক্লাস্টারটি সাধারণ সার্জিক্যাল যন্ত্র থেকে শুরু করে চক্ষু, স্ত্রীরোগ, অর্থোপেডিক এবং নিউরোসার্জারির বিশেষ যন্ত্র উৎপাদন করছে।

আধুনিক যুগ

আধুনিক বিশ্বের চাহিদা অনুসারে, ক্রমাগত এই শিল্প আধুনিকীকরণের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করা হচ্ছে। CSIR-CMERI-এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা এবং প্রায় ₹৬ কোটি টাকার কমন ফেসিলিটি সেন্টার (CFC) স্থাপন হয়েছে ফুলতলার পিয়ালী টাউনে।

বর্তমানে এই ক্লাস্টারএর সামগ্রিক চিত্র অনেক আধুনিক হয়েছে। প্রায় ১,৪৭৭ ধরনের বিভাগএর ৩২,০০০ এর ও বেশি প্রকারের উপকরণ তৈরি হচ্ছে। মোটামুটিভাবে ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ মানুষ প্রত্যক্ষ ভাবে এই ক্লাস্টার এর সঙ্গে যুক্ত আছে। প্রায় ২০০ থেকে ৫০০ MSME ইউনিট অনুসারী শিল্প হিসাবে এই শিল্পের সাথে যুক্ত আছে।

সাপ্লাই চেইন

বারুইপুর সার্জিকাল শিল্পের সাপ্লাই চেইন হল একটি হাইব্রিড সিস্টেম। এখানে চিরাচরিত ভাবে কুটির শিল্পে কর্মকারদের হাতে তৈরী সেমি- ফিনিশড প্রোডাক্ট কে আধুনিক মেশিনারির সাহায্যে বিশ্বমানের ফিনিশড প্রোডাক্ট এ রূপান্তরিত করা হয়। মেডিকেল-গ্রেড স্টেইনলেস স্টিল (AISI 410, 420, 304, 316L) এখানে প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যা সাধারণত কলকাতার বাজার থেকে এবং কিছু ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়।

উৎপাদন প্রক্রিয়া

উৎপাদন প্রক্রিয়া এখানে কয়েকটি ধাপে করা হয়

ব্র্যান্ডিং এবং প্যাকেজিং

শুরুথেকে, ক্লাস্টারটি একটি হোয়াইট-লেবেল মডেলের অধীনে পরিচালিত হয়েছে, যেখানে পণ্যগুলি স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হয় কিন্তু মেট্রোপলিটন শহরগুলিতে বড় সংস্থাগুলি দ্বারা ব্র্যান্ডেড এবং বাজারজাত করা হয়। কিন্তু বর্তমানে, এখানকার বড় সংস্থাগুলি ধীরে ধীরে স্বাধীন ব্র্যান্ডিং কৌশল গ্রহণ করছে। নিজেরাই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মার্কেটিং করছে, বিভিন্ন শিল্প বাণিজ্য মেলায় অংশ নিচ্ছে, নিজেদের উৎপাদিত পণ্য দেশের সামনে তুলেধরছে। একথা জানালেন চ্যাটার্জী সার্জিকাল এর কর্ণধার।

ডিস্ট্রিবিউশন এবং মার্কেটিং

একাধিক উপায়ে এদের পণ্য বাজারজাত করা হয় :

রপ্তানির সুযোগ বর্তমান স্থিতি

বারুইপুর সার্জিকাল শিল্প ভারতের অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।
প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলির মধ্যে রয়েছে:

উন্নত দেশ : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য
প্রতিবেশী দেশ : বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান
অন্যান্য দেশ : সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং আফ্রিকান দেশ

আনুমানিক 10টি বড় ইউনিট সরাসরি রপ্তানিতে নিযুক্ত রয়েছে, যেখানে ছোট ইউনিটগুলি সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অবদান রাখে। মূল রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে ফোর্সেপ, সার্জিক্যাল কাঁচি, চক্ষু সংক্রান্ত যন্ত্র এবং মাইক্রো-সার্জিক্যাল টুল।

অর্থনৈতিক চিত্র :

MSME মন্ত্রকের পূর্ববর্তী রিপোর্টএ প্রায় 200 ইউনিটের জন্য ক্লাস্টারের মোট টার্নওভার আনুমানিক ৬ কোটির কাছাকাছি দেখানো হলেও বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে প্রধান ইউনিট গুলির টার্নওভার এর একটা অনুমান ২০২৪-২৫ সালের জন্যে পাওয়া যায়। পরিসংখ্যান টি নিম্নরূপ :
এম এস কাঞ্জি সার্জিক্যাল প্রাইভেট লিমিটেড: 31 মার্চ, 2025-এ শেষ হওয়া আর্থিক বছরে ₹12.6 কোটি রাজস্ব জেনারেট করেছে।
ইন্দো ওয়েবাল সার্জিক্যাল প্রা. লিমিটেড: 31 মার্চ, 2024-এ শেষ হওয়া আর্থিক বছরে ₹6.73 কোটি আয়ের রিপোর্ট করেছে।
চ্যাটার্জি সার্জিক্যাল: ₹1.5 কোটি থেকে ₹5 কোটির মধ্যে আনুমানিক একটি বার্ষিক টার্নওভার করে থাকে ।
অন্যান্য ছোট ইউনিট: বেশিরভাগ ইউনিট হল একক মালিকানা বা ক্ষুদ্র-উদ্যোগ যার ব্যক্তিগত বার্ষিক টার্নওভার সাধারণত গড়ে ₹0.5 কোটির নিচে থাকে।

বিভিন্ন কারণে বারুইপুরের এই শিল্প ক্লাস্টার বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক বাজারএ পৌঁছতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।

  1. প্রযুক্তিগত এবং গুণমান:
    পরীক্ষার সুবিধার অভাব: কাঁচামাল হিসাবে ব্যাবহৃত স্টিলের গুণমান পরীক্ষা করার জন্য বর্তমানে কোনও স্থানীয় সুবিধা নেই। এর ফলে যন্ত্রগুলিতে মরিচা পড়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে যা সামগ্রিক ভাবে সুনাম ক্ষুন্ন করছে।
  2. ব্র্যান্ডিং হোয়াইট-লেবেলিং আধিপত্য: ক্লাস্টারের একটি বড় অংশ সাদা-লেবেলযুক্ত ব্যবসা হিসাবে কাজ করে। স্থানীয় নির্মাতারা প্রায়ই দিল্লি বা মুম্বাইতে তৃতীয় পক্ষের সংস্থাগুলির কাছে ব্র্যান্ডবিহীন পণ্য বিক্রি করে, যারা তারপরে রপ্তানির জন্য প্যাকেজ করে এবং ব্র্যান্ড করে । বারুইপুরের কারিগরদের উচ্চ লাভের মার্জিন এবং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত করে।
    প্রত্যক্ষ রপ্তানির অভাব: মাত্র 10টি বড় ইউনিটের সরাসরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষমতা রয়েছে, বাকিগুলির মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের বাইপাস করার জন্য বিপণনের অন্তর্দৃষ্টি এবং সরবরাহের অভাব রয়েছে।
  3. সাপ্লাই চেইন এবং আর্থিক চাপ:
    কাঁচামালের খরচ বাড়ছে, মেডিক্যাল-গ্রেড স্টেইনলেস স্টিল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, প্রায়শই স্বল্প সময়ের মধ্যে চড়া দামে কিনতে হয় ।
    চড়া ঋণের খরচ, অনেক ছোট ইউনিট ঋণের উচ্চ সুদের হারের সাথে লড়াই করে, যা CNC মেশিন বা আধুনিক সারফেস ফিনিশিং সরঞ্জামের মতো নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করার ক্ষমতাকে সীমিত করে।
  4. মানব সম্পদ ও পেশাগত পরিবেশ
    শিল্পটি দক্ষ শ্রম ধরে রাখতে অসুবিধার সম্মুখীন, কারণ তরুণ প্রজন্ম প্রায়ই অন্যান্য সেক্টরে কম শারীরিকভাবে চাহিদাযুক্ত কাজ খোঁজে।
    পেশাগত আঘাত, কর্মকারদের কাজ অত্যন্ত আঘাত প্রবণ, বিশেষ করে আঙ্গুল এবং পিঠকে প্রভাবিত করে, যা দীর্ঘমেয়াদী উত্পাদনশীলতা এবং স্বাস্থ্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে।
  5. নীতি ও নিয়ন্ত্রক বাধা
    নিয়ন্ত্রক সম্মতি, কঠোর সরকারী নিরাপত্তা মান এবং আন্তর্জাতিক মেডিকেল ডিভাইস প্রবিধান নেভিগেট করা ছোট নির্মাতাদের জন্য একটি বাধা রয়ে গেছে যাদের ডেডিকেটেড কমপ্লায়েন্স টিমের অভাব রয়েছে।
Screenshot

অসাধু চক্রের মাধ্যমে নেপাল হয়ে চোরাপথে পাকিস্তানের তৈরি প্রোডাক্ট সস্তা দামে বাজারে ঢোকার কারণে, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হচ্ছে।

বাংলার অসাধু রাজনৈতিক মাতব্বরদের হাতে পড়ে, সরকারি সাহায্যে তৈরি করা ₹৬ কোটি টাকার কমন ফেসিলিটি সেন্টার (CFC) বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ইউনিট গুলি এখনও ম্যানুয়াল ফোরজিং এবং পুরানো মেশিনিং প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করে, যা আন্তর্জাতিক চিকিৎসা মানক গুলির জন্য যথেষ্ট নয়।

প্রতিবার ভোট আসে ভোট যায় সমস্যা থেকে যায় একই জায়গায়। যে কমন ফেসিলিটি সেন্টার (CFC) হতে পারতো গেম চেঞ্জার, বারুইপুর কে এতদিনে পৃথিবী বিখ্যাত করতে পারতো, কিছু অজ্ঞ রাজনৈতিক মাতব্বরদের চক্রে পড়ে সমস্যা সেই তিমিরেই রয়ে গেছে।

তথ্যসূত্র

Exit mobile version