বিশ্ব রাজনীতির যুদ্ধের আবহের মধ্যে যুদ্ধের খবরের চেয়েও এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির খবর। কোনো দেশ যুদ্ধের মধ্যে প্রত্যক্ষ ভাবে না জড়ালেও । তেলের প্রসঙ্গ এলে অবধারিত ভাবে জড়িয়ে পড়ে যেকোনো দেশের স্বার্থ। সেই পরিস্হিতিতে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখা এক কথায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আর এই কঠিন এবং জটিল কাজটাই ভারত আজকের জটিল পরিস্থিতিতে করে চলেছে। একদিকে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কিনছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখছে। আবার সুযোগ তৈরি হলে লাতিন আমেরিকার বাজারেও প্রবেশ করছে। এই বহুমুখী কৌশলই ভারতের কূটনীতির সবচেয়ে বড় সফলতা। ভারতের অর্থনীতি যত বড় হচ্ছে, জ্বালানির প্রয়োজনও তত বাড়ছে। প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ কর্মস্থলে যাচ্ছে, হাজার হাজার কারখানা চলছে, বিমান উড়ছে, পণ্য পরিবহণ হচ্ছে। এই বিশাল ব্যবস্থার জ্বালানি যোগান নিশ্চিত রাখা যে কোনও সরকারের কাছে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ ভারতের নিজস্ব উৎপাদন দেশের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। চাহিদার সিংহভাগই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।
তাই একদিকে ভারতের আছে প্রয়োজন। অন্যদিকে বড়বড় দেশ গুলোকে বুঝিয়ে দিয়েছে ভারত হল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল ব্যবহারকারী দেশ। বিশ্বের প্রায় সব বড় তেল উৎপাদক দেশই তাকে গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা হিসেবে দেখতে বাধ্য। তাই কোনো রকম ভিক্ষা নয়, চোখে চোখ রেখে বুঝিয়ে দিয়েছে গিভ এন্ড টেক পলিসি। যেখানে দাম কম, যেখানে সরবরাহ নির্ভরযোগ্য, যেখানে দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে— ভারত সেখান থেকেই তেল কিনতে প্রস্তুত। এটাই আধুনিক ভারত।
রাশিয়া , আমেরিকা সুপার পাওয়ার দেশ গুলোর অর্থনীতি আজ দীর্ঘ যুদ্ধের প্রভাবে বেশ বিপর্যস্ত। রাশিয়া ভারতকে দীর্ঘদিন সস্তা তেল সরবরাহ করে যুদ্ধের সংকটে লাভবান হয়েছে। যেটা আমেরিকার কাছে চক্ষুশূল ছিল। ভেনেজুয়েলার দখল নেওয়ার পরে, সেই জায়গাটা আমেরিকা নিতে চাইছে। রাশিয়ার বাণিজ্যে একটা ধাক্কা দেওয়া যাবে আর নিজের অর্থনীতিতেও অক্সিজেন এর যোগান হবে। আর ভারত, যেখানে দাম কম, ভারত সেখান থেকেই তেল কিনতে প্রস্তুত।
একটা সময় ছিল যখন বিশ্বের তেলের বাজার মানেই ছিল মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা, রাশিয়া আর বড় বড় শক্তিধর দেশের খেলা। কে কাকে সমর্থন করবে, কার উপর নিষেধাজ্ঞা হবে, কোথায় যুদ্ধ লাগবে—এসবের উপরই নির্ভর করত তেলের দাম। মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তা, রাশিয়া-ইউরোপ সম্পর্কের টানাপোড়েন, নতুন বাণিজ্য জোটের উত্থান এবং লাতিন আমেরিকার পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি— সব মিলিয়ে বিশ্ব তেলের বাজার নতুন সমীকরণের পথে।
ভারতের কাছে জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। দেশের মোট চাহিদার ৮০ শতাংশেরও বেশি তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তাই তেলের দাম বাড়লে শুধু পেট্রোল-ডিজেল নয়, খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে পরিবহন, উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বেড়ে যায়।
ভারতের অবস্থান কেন অন্যদের থেকে আলাদা ?
অনেক দেশ একটি বা দুটি উৎসের উপর নির্ভর করে। ভারত তা করেনি। ভারত ধীরে ধীরে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে যেখানে বিভিন্ন দেশ থেকে তেল কেনা যায়।
আজ ভারতের তেল আসে মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এমনকি আমেরিকা থেকেও।এর ফলে কোনো একটি অঞ্চলে সমস্যা তৈরি হলেও ভারতের বিকল্প ব্যবস্থা থাকে। এই বৈচিত্র্যই ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি।
সস্তা তেলের পেছনের বড় অর্থনীতি , ভারতের বহু বছর আগের দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত আজ ফল দিচ্ছে
সব তেল একরকম নয়। কিছু তেল খুব পরিষ্কার এবং সহজে পরিশোধন করা যায়। আবার কিছু তেল ভারী, ঘন এবং সালফারযুক্ত। বিশ্বের অনেক রিফাইনারি এই ধরনের কঠিন তেল প্রক্রিয়াজাত করতে পারে না। ভারত বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করে এমন রিফাইনারি তৈরি করেছে যা বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন তেলও প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। আজ সেই দূরদর্শিতার ফল মিলছে। যখন ভারী তেলের দাম কমে যায়, তখন ভারত সেটি কম দামে কিনে উচ্চমূল্যের জ্বালানিতে রূপান্তর করে বেশি লাভ করতে পারে।
ভারতের গোপন অস্ত্র: আধুনিক রিফাইনারি
গুজরাট উপকূলে রিলায়েন্স গোষ্ঠীর জামনগর , রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে নির্মিত নায়ারা এনার্জির ভাদিনার এর বিশাল রিফাইনারিগুলো আজ বিশ্বের সেরা প্রযুক্তি দ্বারা পরিচালিত ।
এই রিফাইনারিগুলো ভারী তেল প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম ; সালফার অপসারণ করতে, জটিল হাইড্রোকার্বন ভাঙতে, উন্নতমানের ডিজেল ও জেট ফুয়েল তৈরি করতে, আন্তর্জাতিক পরিবেশ মান পূরণ করতে বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি তৈলশোধনাগার এর মধ্যে অন্যতম।
অনেক দেশ তেল কিনতে পারে। কিন্তু খুব কম দেশই বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন তেল থেকে সর্বোচ্চ মূল্য বের করতে পারে। ভারত সেই কয়েকটি দেশের মধ্যে অন্যতম। কাঁচা তেল থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি শক্তি ভারত শুধু তেল আমদানি করে না। ভারত তেলকে মূল্যবান পণ্যে রূপান্তর করে। বিদেশ থেকে কাঁচা তেল আসে। তারপর তা রূপান্তরিত হয় ডিজেলে, পেট্রোলে, জেট ফুয়েলে, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যে।
এরপর সেই পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। অর্থাৎ ভারত এখন শুধু ক্রেতা নয়, বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র।কূটনীতিতেও বাড়ছে ভারতের শক্তি, ভারতের এই নীতি শুধু অর্থনৈতিক লাভ দেয় না। এটি কূটনৈতিক শক্তিও বাড়ায়। তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো ভারতের বাজার চায়। জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো ভারতের রিফাইনারি সক্ষমতার উপর নির্ভর করে। ফলে আন্তর্জাতিক আলোচনায় ভারতের গুরুত্বও বাড়ছে। আজ বিশ্বের বড় শক্তিগুলো ভারতের অবস্থানকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য।
ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী নির্মিত তৈল শোধনাগার, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংকট সময়ে নীরবে ত্রাতার ভূমিকা পালন করছে। যাদের ওপর ভরসা করে ভারত আজ আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় কূটনীতির ঘুটি সাজাচ্ছে। যেসব রাজনৈতিক দলগুলো ভারতের শিল্পপতি আম্বানি আদানিদের মুণ্ডুপাত নাকরে জলস্পর্শ করে না। কথায় কথায় সরকারকে নিশানা করে, তারা আজ মুখে কুলপি এঁটেছে।
ভেনেজুয়েলার মতো সুযোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ ?
যদি ভেনেজুয়েলা বিশ্ববাজারে আরও বড় পরিমাণে তেল সরবরাহ করতে পারে, তাহলে ভারত তার অন্যতম বড় সুবিধাভোগী হতে পারে।কারণ ভেনেজুয়েলার তেল অত্যন্ত ভারী। অনেক দেশের রিফাইনারি এটি কার্যকরভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে পারে না। কিন্তু ভারতের উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন রিফাইনারিগুলো এই ধরনের তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্যই তৈরি। ফলে সঠিক মূল্য এবং সঠিক বাণিজ্যিক শর্ত থাকলে ভারত এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে।
আগামী দিনের বিশ্বের জ্বালানি মানচিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। নতুন জোট তৈরি হচ্ছে। হরমুজ এর কারণে পুরনো বাণিজ্য পথ বদলাচ্ছে।
কিন্তু এই পরিবর্তনের মাঝেও বিশ্বরাজনীতিতে ভারতের দৃঢ় অবস্থান, আন্তজাতিক ক্ষেত্রে বিশেষ সমীহ আদায় করছে। জাতীয় স্বার্থই শেষ কথা। যেখানে দেশের লাভ, সেখানেই ভারতের সায়। এটাই আধুনিক ভারত।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
