কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬-২৭-এ রাজ্যের কৃষি ও মৎস্য অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, ফসল বিমার সম্প্রসারণ, বাজার সংযোগ উন্নয়ন এবং ব্লু ইকোনমির বিকাশকে কেন্দ্র করে বাজেটের একটি বড় অংশ সাজানো হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী ড. স্বপন দাশগুপ্ত তাঁর বাজেট বক্তৃতায় জানান, কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, লাভজনক, জলবায়ু সহনশীল এবং প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে মৎস্য, দুগ্ধ, পশুপালন এবং উদ্যানপালনকে কৃষির সহায়ক খাত হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কৃষকদের জন্য বড় ঘোষণা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাগুলির মধ্যে রয়েছে কৃষক পরিবারকে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা। কেন্দ্রের PM-KISAN প্রকল্পে বছরে ₹৬,০০০ পাওয়ার পাশাপাশি রাজ্য সরকার প্রতি কৃষক পরিবারকে বছরে অতিরিক্ত ₹৩,০০০ দেওয়ার ঘোষণা করেছে।
এছাড়া কৃষি সেচে ব্যবহৃত সাবমার্সিবল পাম্পের বিদ্যুৎ ব্যবহারে ইউনিট প্রতি ₹২ ভর্তুকি দেওয়া হবে। ফলে কৃষি উৎপাদনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ফসল বিমার আওতায় ১৬টি ফসল
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা (PMFBY)-এর আওতায় চলতি খরিফ মরশুম থেকে ১৬টি ফসল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিশেষ করে আলু চাষিদের জন্য আরও একটি বড় ঘোষণা করা হয়েছে। আলু ফসল বিমায় কৃষকদের যে প্রিমিয়াম দিতে হয়, তার ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত অংশ রাজ্য সরকার বহন করবে।
ধানচাষিদের জন্য MSP-র উপরে অতিরিক্ত সহায়তা
ধানচাষিদের স্বার্থে সরকার খরিফ মরশুমে MSP-এর উপরে প্রতি কুইন্টালে অতিরিক্ত ₹২০০ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকার ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে ধানের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP) ₹৩,১০০ প্রতি কুইন্টালে উন্নীত করার রূপরেখাও ঘোষণা করেছে।
সেচ ব্যবস্থায় ব্যাপক বিনিয়োগ
কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সেচ অবকাঠামো উন্নয়নে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের ৩.৪২ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য ₹২০০ কোটি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাইক্রো ইরিগেশন ব্যবস্থায় উৎসাহিত করতে ₹১০০ কোটি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ডিজিটাল কৃষির যুগে প্রবেশ
রাজ্যে ডিজিটাল এগ্রিকালচার মিশন চালু করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে কৃষকদের জমির রেকর্ড, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ফসলের তথ্য একত্রিত করা হবে।
RBI-এর Unified Lending Interface (ULI)-এর মাধ্যমে ডিজিটাল কিষাণ ক্রেডিট কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কৃষি ঋণ অনুমোদনের সময় ১৫ দিন থেকে কমে মাত্র ১৫ মিনিটে নেমে আসতে পারে।
প্রাকৃতিক চাষ ও AI-ভিত্তিক কৃষি
রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক কৃষিকে উৎসাহ দেওয়া হবে। পাশাপাশি IIT খড়্গপুরের সহযোগিতায় AI-ভিত্তিক Precision Agriculture প্রযুক্তি কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ড্রোন, স্মার্ট সেন্সর এবং GPS প্রযুক্তির মাধ্যমে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার আরও বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালিত হবে।
উদ্যানপালনে বিশেষ জোর
রাজ্য সরকার ফল, সবজি ও ফুলচাষের উন্নয়নে একাধিক পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে।
- ১০০ মেট্রিক টন পর্যন্ত বহুমুখী স্টোরেজ ও কোল্ড চেইন অবকাঠামোর জন্য ৩৫% ভর্তুকি
- উত্তরবঙ্গ, হাওড়া, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরে বাণিজ্যিক ফুলচাষ ক্লাস্টার
- মালদহ ও মুর্শিদাবাদে আমের ভ্যালু চেইন উন্নয়ন
- আম রপ্তানির জন্য ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও প্যাক হাউস
ব্লু ইকোনমি ও মৎস্যখাতে বড় পরিকল্পনা
এই বাজেটের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল ব্লু ইকোনমি উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব।
রাজ্যের রয়েছে –
- ৮ লক্ষ হেক্টরের বেশি অভ্যন্তরীণ জলাশয়
- ১৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা
এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকার ঘোষণা করেছে –
- আধুনিক মাছের বীজ উৎপাদন কেন্দ্র
- মাছ উৎপাদন খামার
- কোল্ড চেইন অবকাঠামো
- মাছ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র
- উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক শৈবাল (Seaweed) চাষ
এসব প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনার আওতায় বাস্তবায়িত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে মৎস্যজীবীদের আয় বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
পরিসংখ্যান এক নজরে
| প্রকল্প/ঘোষণা | পরিমাণ |
|---|---|
| কৃষক পরিবারকে অতিরিক্ত সহায়তা | বছরে ₹৩,০০০ |
| কৃষি সেচে বিদ্যুৎ ভর্তুকি | ইউনিট প্রতি ₹২ |
| ড্রেনেজ উন্নয়ন | ₹২০০ কোটি |
| মাইক্রো ইরিগেশন সহায়তা | ₹১০০ কোটি |
| স্প্রিং পুনরুজ্জীবন প্রকল্প | ₹৫০ কোটি |
| মূল্য স্থিতিকরণ তহবিল | ₹১০০ কোটি |
| কোল্ড স্টোরেজ ও সংরক্ষণ অবকাঠামো | ₹১০০ কোটি |
| রোগমুক্ত আলু বীজ বিতরণ | ₹১০০ কোটি |
| ফুলচাষ ক্লাস্টার | ₹১০ কোটি |
| আম ভ্যালু চেইন উন্নয়ন | ₹৫০ কোটি |
| সৌর সেচ ভর্তুকি | ₹৫০ কোটি |
| ধানে অতিরিক্ত প্রণোদনা | কুইন্টাল প্রতি ₹২০০ |
| লক্ষ্যমাত্রা MSP | ₹৩,১০০ প্রতি কুইন্টাল |
| তিস্তা প্রকল্পে সেচ সুবিধা | ৩.৪২ লক্ষ হেক্টর |
| উপকূলরেখা | ১৫৮ কিমি |
| অভ্যন্তরীণ জলাশয় | ৮ লক্ষ হেক্টরের বেশি |
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বাজেটের সবচেয়ে বড় শক্তি হল কৃষকদের সরাসরি আয় সহায়তা এবং বাজারমুখী কৃষি অবকাঠামো উন্নয়নের সমন্বয়।
ইতিবাচক দিক
✔ কৃষক আয় বৃদ্ধির সরাসরি পদক্ষেপ
✔ MSP-র উপরে অতিরিক্ত প্রণোদনা
✔ কৃষি ঋণে ডিজিটাল বিপ্লব
✔ মৎস্য ও ব্লু ইকোনমিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ
✔ কোল্ড চেইন ও সংরক্ষণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ
চ্যালেঞ্জ
✔ প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি
✔ ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া
✔ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা
✔ বাজারে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা
পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬-২৭ স্পষ্টভাবে কৃষি, সেচ, উদ্যানপালন এবং মৎস্যখাতকে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কৃষকদের নগদ সহায়তা, MSP প্রণোদনা, ডিজিটাল কৃষি, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা এবং ব্লু ইকোনমির ওপর জোর আগামী কয়েক বছরে রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে। তবে প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত প্রকল্পগুলির কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
