যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাজার, কেন বিশ্বের নজরে ভারতের এই ক্ষেপণাস্ত্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ ক্রমশই বাড়ছে। একসময় যে অস্ত্রকে ভারত-রাশিয়ার যৌথ প্রতিরক্ষা প্রকল্প হিসেবে দেখা হত, আজ সেটিই ভারতের প্রতিরক্ষা-স্বনির্ভরতা, কৌশলগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাজারে ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে। ব্রহ্মোসকে ঘিরে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তার গতি, নির্ভুলতা, বহুমুখী ব্যবহার এবং সর্বোপরি যুদ্ধক্ষেত্রে তার কার্যকারিতা। সম্প্রতি ‘Taiwan Talks’-এ ব্রহ্মোসকে ঘিরে এক বিস্তৃত আলোচনায় ভারতের প্রাক্তন লেফটেন্যান্ট জেনারেল পি. আর. শঙ্কর, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সাংবাদিক নীতিন গোখলে এবং Taiwan Defense Studies Initiative-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ট্রিস্টান ট্যান অংশ নেন। আলোচনায় উঠে আসে ব্রহ্মোসের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থেকে শুরু করে অপারেশন সিঁদুর, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সামরিক অভিযান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির ক্রমবর্ধমান আগ্রহ, সবই।
ব্রহ্মোস: যৌথ উদ্যোগ থেকে ভারতীয় সক্ষমতার প্রতীক
‘ব্রহ্মোস’ নামটি এসেছে ভারতীয় ব্রহ্মপুত্র এবং রাশিয়ার মস্কভা নদীর নামের সমন্বয়ে। ১৯৯৮ সালে ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পের সূচনা। যৌথ উদ্যোগের কাঠামো আজও রয়েছে; কিন্তু গত কয়েক দশকে ব্রহ্মোস প্রযুক্তির ভারতীয়করণ যে মাত্রায় এগিয়েছে, সেটিই এই ক্ষেপণাস্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল পি. আর. শঙ্করের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে ভারত ও রাশিয়া উভয়েই প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উপাদান সরবরাহ করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারত নিজস্ব প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করেছে। ফলে ব্রহ্মোসকে কেবল ‘রুশ-ভারত যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র’ হিসেবে দেখা এখন আর যথেষ্ট নয়। এখানেই ব্রহ্মোসের গল্প ভারতের বৃহত্তর প্রতিরক্ষা-স্বনির্ভরতার গল্পের সঙ্গে মিশে যায়। একটি যৌথ প্রকল্প কীভাবে ধীরে ধীরে ভারতীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বাহনে পরিণত হয়েছে, ব্রহ্মোস তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
কী এমন বিশেষ ব্রহ্মোসে ?
ব্রহ্মোসের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য তার অত্যন্ত উচ্চ গতি। এটি সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং উচ্চ গতির কারণে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের সময় প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়ার সুযোগ কমিয়ে দেয়। কিন্তু শুধু গতি নয়, ব্রহ্মোসের আসল শক্তি তার বহুমুখিতায়। স্থলভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম, যুদ্ধজাহাজ এবং বিমান, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে ব্রহ্মোস ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে একটি মাত্র ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বিভিন্ন ধরনের সামরিক পরিস্থিতিতে ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি উড়ে যাওয়ার মতো ‘sea-skimming’ সক্ষমতা এবং বিভিন্ন ধরনের আক্রমণাত্মক ট্রাজেক্টরি ব্যবহারের ক্ষমতাও এর কার্যকারিতা বাড়ায়। অর্থাৎ, ব্রহ্মোস শুধুমাত্র একটি ক্ষেপণাস্ত্র নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক আক্রমণ ব্যবস্থা।এই কারণেই ভারতের সামরিক কৌশলে ব্রহ্মোসের গুরুত্ব এত বেশি।
অপারেশন সিঁদুরে ব্রহ্মোসের ভূমিকা
‘Taiwan Talks’-এর আলোচনায় অপারেশন সিঁদুরের বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরা হয়। লেফটেন্যান্ট জেনারেল শঙ্করের ব্যাখ্যায়, ৭ মে সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটিতে ভারতের প্রথম আঘাতে মূলত আর্টিলারি এবং ড্রোন ব্যবহৃত হয়। পরবর্তী পর্যায়ে নজরদারি ও সশস্ত্র ড্রোনের মাধ্যমে পাকিস্তানের সামরিক বিন্যাস, রাডার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নজর রাখা হয়। এরপর ৯ ও ১০ মে-র পর্যায়ে ব্রহ্মোস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় বলে আলোচনায় দাবি করা হয়। বিশেষ করে পাকিস্তানের একাধিক সামরিক বিমানঘাঁটিতে আঘাতের প্রসঙ্গে ব্রহ্মোসের নাম উঠে আসে। আলোচনায় বলা হয়, ক্ষেপণাস্ত্রটির গতি, নির্ভুলতা এবং প্রতিহত করা কঠিন হওয়ার বৈশিষ্ট্য পাকিস্তানের সামরিক পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে কার্যকর আঘাত হানতে সাহায্য করে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শিক্ষা রয়েছে, আধুনিক যুদ্ধে শুধু অস্ত্রের সংখ্যা নয়, সেন্সর, নজরদারি, কমান্ড ও কন্ট্রোল, তথ্য এবং নির্ভুল আঘাতের সমন্বয় যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করতে পারে। ব্রহ্মোস সেই সমন্বিত ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণাত্মক উপাদান।
‘চোখে দেখা’ যুদ্ধ-সক্ষমতা বদলে দিয়েছে ভারতের ভাবমূর্তি
ব্রহ্মোস নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহের অন্যতম কারণ তার ‘combat credibility’। অস্ত্রের বিজ্ঞাপন এবং অস্ত্রের বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার, দুটি এক জিনিস নয়। বহু বছর ধরে ভারতীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল দেশীয় অস্ত্রের সক্ষমতা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক আস্থার ঘাটতি। ব্রহ্মোস সেই ধারণা বদলাতে শুরু করেছে। যদি একটি অস্ত্রব্যবস্থা বাস্তব সংঘাতে তার সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। ব্রহ্মোসের ক্ষেত্রেও সেই পরিবর্তন স্পষ্ট। ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য এটি একটি বড় কূটনৈতিক সম্পদ।
দক্ষিণ চিন সাগর ঘিরে তৈরি হচ্ছে ‘ব্রহ্মোস বেল্ট’?
ব্রহ্মোসের আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। ২০২২ সালে ফিলিপিন্স ব্রহ্মোসের উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনে। পরবর্তী সময়ে ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে চুক্তি ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানির নতুন অধ্যায় খুলেছে। এই তিনটি দেশেরই দক্ষিণ চিন সাগরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, চিনকে ঘিরে কি ধীরে ধীরে একটি ‘ব্রহ্মোস বেল্ট’ তৈরি হচ্ছে?এর উত্তর সরল নয়। এই দেশগুলির প্রত্যেকটির নিজস্ব নিরাপত্তা-চাহিদা এবং কৌশলগত হিসাব রয়েছে। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন, দক্ষিণ চিন সাগরের মতো বিতর্কিত সামুদ্রিক অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত কম খরচে দীর্ঘ-পাল্লার উপকূলভিত্তিক অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র একটি ছোট বা মাঝারি শক্তির দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘asymmetric capability’ তৈরি করতে পারে। বড় যুদ্ধজাহাজের বহর গড়ে তোলার তুলনায় স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে কম ব্যয়বহুল এবং প্রতিপক্ষের জন্য একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই কারণেই ব্রহ্মোস শুধু ভারতের জন্য নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
চিনের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
চিনের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্রহ্মোসের প্রসঙ্গটি শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য। ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ যদি উন্নত অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়ায়, তাহলে দক্ষিণ চিন সাগরে চিনা নৌবাহিনীর কার্যক্রমের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা একটি ‘denial capability’ তৈরি করে—অর্থাৎ প্রতিপক্ষকে নির্দিষ্ট সমুদ্রাঞ্চলে প্রবেশ বা স্বাধীনভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে বাধ্য করে। এখানেই ব্রহ্মোসের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব। ভারত যখন ব্রহ্মোস রফতানি করে, তখন শুধু একটি অস্ত্র বিক্রি করে না; ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির প্রতিরক্ষা-সম্পর্কও গভীর হয়।
ভারতীয় অস্ত্রের সঙ্গে বদলাচ্ছে কূটনীতির ভাষা
ব্রহ্মোসের সাফল্যের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, এটি ভারতের প্রতিরক্ষা কূটনীতিকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারত বিশ্বের বড় অস্ত্র আমদানিকারকদের অন্যতম ছিল। রাশিয়া, ফ্রান্স, ইজরায়েল, আমেরিকা-সহ বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে ভারত বিপুল পরিমাণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনেছে। কিন্তু এখন ছবিটি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। ভারত নিজেই অস্ত্র রফতানি করছে। এবং শুধু ছোটখাটো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নয়, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও। এই পরিবর্তনের তাৎপর্য অনেক বড়। অস্ত্র রফতানির সঙ্গে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, সামরিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক জড়িয়ে থাকে। ফলে একটি ব্রহ্মোস চুক্তি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের দরজা খুলে দিতে পারে।
‘ব্রহ্মোস চাই’ আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন ভারত
ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের মন্তব্যও এই পরিবর্তনের প্রতীক। ব্রহ্মোস পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে তিনি আরও ব্যবস্থা কেনার আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছেন। এই ধরনের বক্তব্য ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কারণ এর অর্থ, ভারতীয় অস্ত্র এখন শুধু ‘সস্তা বিকল্প’ হিসেবে নয়, কার্যকর এবং বিশ্বাসযোগ্য সামরিক ব্যবস্থা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। আর এখানেই ‘Make in India’ এবং ‘Atmanirbhar Bharat’-এর প্রকৃত পরীক্ষা। দেশের জন্য অস্ত্র তৈরি করা এক জিনিস। অন্য দেশকে সেই অস্ত্র কিনতে রাজি করানো সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। ব্রহ্মোস দ্বিতীয় কাজটিও করতে শুরু করেছে।
শুধু ব্রহ্মোস নয়, তৈরি হচ্ছে বৃহত্তর ভারতীয় প্রতিরক্ষা-পরিচয়
ব্রহ্মোস একা নয়। আকাশের মতো ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং অন্যান্য দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিও ভারতের সামরিক সক্ষমতার নতুন পরিচয় তৈরি করছে। তবে ব্রহ্মোসের ক্ষেত্রে পার্থক্য হল, এর আন্তর্জাতিক বাজার ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলির আগ্রহ ভারতকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করছে।ফলে ভারতের ‘presence’ আর শুধু কূটনৈতিক বিবৃতি বা সামরিক মহড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ভারতীয় প্রযুক্তি এখন অন্য দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠছে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রভাব তৈরি করতে পারে।
ব্রহ্মোসের সবচেয়ে বড় সাফল্য কোথায়?
ব্রহ্মোসের সাফল্যকে শুধু ‘Mach’ বা পাল্লার সংখ্যায় মাপলে ভুল হবে। এর প্রকৃত সাফল্য তিনটি স্তরে।
প্রথমত, সামরিক স্তরে – উচ্চ গতি, নির্ভুলতা, বহুমুখী প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন ধরনের আক্রমণ সক্ষমতা এটিকে শক্তিশালী অস্ত্রব্যবস্থায় পরিণত করেছে।
দ্বিতীয়ত, শিল্পগত স্তরে – ভারত দেখাতে পেরেছে যে একটি আন্তর্জাতিক যৌথ প্রকল্পকে সময়ের সঙ্গে নিজের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর দাঁড় করানো সম্ভব।
তৃতীয়ত, কূটনৈতিক স্তরে – ব্রহ্মোস ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানি এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
এই তৃতীয় দিকটিই সম্ভবত দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের সামনে নতুন সুযোগ, নতুন দায়িত্বও
তবে ব্রহ্মোসের সাফল্যকে ঘিরে অতিরিক্ত আত্মতুষ্টিরও অবকাশ নেই। কোনও অস্ত্রই অপরাজেয় নয়। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি নজরদারি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, স্যাটেলাইট, ড্রোন, বিমান প্রতিরক্ষা, কমান্ড ও কন্ট্রোল এবং যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য-সমন্বয় সমান গুরুত্বপূর্ণ। চিনের মতো প্রযুক্তিগত ও সামরিকভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা আরও জটিল হবে। তাই ব্রহ্মোসের সাফল্য ভারতের জন্য শেষ নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তি তৈরির সূচনা।
বদলে যাচ্ছে ভারতের অবস্থান
একসময় ভারতকে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে প্রধানত একজন ক্রেতা হিসেবে দেখা হত। এখন সেই পরিচয়ের পাশে আরেকটি পরিচয় যুক্ত হচ্ছে ভারত একজন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সরবরাহকারী। ব্রহ্মোস সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক। আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একের পর এক দেশ যখন এই ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে তাকাচ্ছে, তখন বিষয়টি কেবল অস্ত্র কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ, চিনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি এবং ভারতের ‘Act East’ নীতির বাস্তব রূপ। অতএব, ব্রহ্মোসের গল্প আসলে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের গল্প নয়। এটি ভারতের সামরিক প্রযুক্তি থেকে প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রতিরক্ষা শিল্প থেকে অস্ত্র রফতানি, এবং অস্ত্র রফতানি থেকে কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের যাত্রার গল্প। ভারত এমন একটি প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি শক্তি হয়ে উঠছে, যার অস্ত্র অন্য দেশের নিরাপত্তা-সমীকরণও বদলে দিতে পারে, ব্রহ্মোসের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাহিদা অন্তত সেই সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
ব্রহ্মোস Aerospace-ও জানিয়েছে যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ এই ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ সম্ভাব্য বাজারটি তিনটি ভৌগোলিক অঞ্চলে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
ব্রহ্মোসের বর্তমান ‘pipeline’ এক নজরে
| দেশ | বর্তমান অবস্থান | তাৎপর্য |
|---|---|---|
| ফিলিপিন্স | চুক্তি সম্পন্ন | প্রথম বিদেশি ক্রেতা; $375m চুক্তি |
| ভিয়েতনাম | চুক্তি স্বাক্ষরিত | সম্ভাব্য প্রায় $630m প্যাকেজ |
| ইন্দোনেশিয়া | চুক্তি সম্পন্ন | তৃতীয় নিশ্চিত বিদেশি ক্রেতা |
| UAE | আলোচনা চলছে | মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য বড় বাজার |
| থাইল্যান্ড | মূল্যায়ন/আগ্রহ | দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা |
| সৌদি আরব | আগ্রহ প্রকাশ | মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য বাজার |
| মিশর | আগ্রহ প্রকাশ | উত্তর আফ্রিকা/মধ্যপ্রাচ্যের সেতুবন্ধ |
| ব্রাজিল | আগ্রহ প্রকাশ | লাতিন আমেরিকায় প্রবেশের সম্ভাবনা |
| চিলি | আগ্রহ প্রকাশ | প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের সম্ভাব্য বাজার |
| দক্ষিণ আফ্রিকা | আগ্রহ প্রকাশ | আফ্রিকায় ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানির সম্ভাবনা |
| মালয়েশিয়া | আগ্রহ প্রকাশ | দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সম্ভাব্য আরও সম্প্রসারণ |

