পশ্চিমবঙ্গের গবেষকদলের সমীক্ষায় নতুন দিশা, জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ বাড়াচ্ছে ব্রেন্ট ক্রুডের অস্থির বাজার, ভারতের তেল আমদানি নির্ভরতা ছুঁয়েছে প্রায় ৮৯ শতাংশ
নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা : সৌরবিদ্যুৎ থেকে বায়ুশক্তি, বিদ্যুৎচালিত গাড়ি থেকে গ্রামীণ মাইক্রো-গ্রিড – নবীকরণযোগ্য জ্বালানির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে নির্ভরযোগ্য শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থার চাহিদা। এই প্রেক্ষাপটে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে হাইব্রিড এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম বা এইচইএসএস (HESS) – একাধিক শক্তি সঞ্চয় প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি ব্যবস্থা, যেখানে ব্যাটারির উচ্চ শক্তি-ঘনত্বের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় আল্ট্রা-ক্যাপাসিটর, ফ্লাইহুইল বা সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেটিক এনার্জি স্টোরেজ (এসএমইএস)-এর দ্রুত সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা। এই ক্ষেত্রেই সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি সমীক্ষাপত্র প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের গবেষক ডঃ সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর দল, যেখানে এই প্রযুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়েছে। একই সময়ে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ঘিরে চলতি বছর ব্রেন্ট ক্রুডের দামে যে অস্থিরতা দেখা গিয়েছে, তা ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির কাছে শক্তি সঞ্চয় ও সবুজ বিকল্পের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
কি এই হাইব্রিড মডেল ?
শক্তি সঞ্চয়ের জগতে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাটারি সবচেয়ে পরিচিত নাম। লিথিয়াম-আয়ন প্রযুক্তির হাত ধরে ব্যাটারির শক্তি-ঘনত্ব (energy density) অনেকটাই বেড়েছে, ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ জোগানোর ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু হঠাৎ বড় মাপের পাওয়ার চাহিদা সামলানো বা বারবার দ্রুত চার্জ-ডিসচার্জের ক্ষেত্রে ব্যাটারির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট – ঘন ঘন ব্যবহারে তার আয়ু কমে, সাড়া দেওয়ার গতিও তুলনায় ধীর।
উল্টো দিকে, আল্ট্রা-ক্যাপাসিটর, ফ্লাইহুইল বা এসএমইএস-এর মতো প্রযুক্তি মিলিসেকেন্ডের মধ্যে বিপুল পরিমাণ শক্তি জোগাতে পারে এবং লক্ষ লক্ষ বার চার্জ-ডিসচার্জ সহ্য করতে পারে, কিন্তু তাদের শক্তি-ঘনত্ব তুলনায় অনেক কম। এই দুই ধরনের প্রযুক্তির পরিপূরক (complementary) বৈশিষ্ট্যকে একত্র করাই হাইব্রিড এনার্জি স্টোরেজের মূল ভাবনা – যাতে একটি ব্যবস্থাতেই মেলে উচ্চ শক্তি এবং উচ্চ পাওয়ার, দুটোই।
সমস্যা ঠিক কোথায় ?
নবীকরণযোগ্য জ্বালানির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ তার অনিশ্চয়তা – মেঘলা দিনে কমে সৌরবিদ্যুৎ, বাতাস না বইলে কমে বায়ুশক্তি। গ্রিডে এই ওঠাপড়া সামলাতে, বিদ্যুৎচালিত গাড়ির দ্রুত চার্জিং জোগাতে বা প্রত্যন্ত এলাকার মাইক্রো-গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এমন একটি ব্যবস্থা দরকার, যা একই সঙ্গে অনেকক্ষণ শক্তি ধরে রাখতে পারে এবং প্রয়োজনে মুহূর্তে বিপুল পাওয়ার জোগাতে পারে। এককভাবে কোনও একটি প্রযুক্তি দিয়ে খরচ, নির্ভরযোগ্যতা ও আয়ুষ্কাল – এই তিন শর্ত একসঙ্গে মেটানো কঠিন। হাইব্রিড ব্যবস্থা এই ফাঁকটাই পূরণ করার চেষ্টা করে।
বর্তমান পরিস্থিতি: বাজার বাড়ছে হু হু করে
বিশ্বজুড়ে হাইব্রিড এনার্জি স্টোরেজের বাজার দ্রুত বাড়ছে। দ্য বিজনেস রিসার্চ কোম্পানির সাম্প্রতিক পর্যালোচনা বলছে, ২০২৫ সালে এই বাজারের আকার ছিল প্রায় ১,৬৯৫ কোটি ডলার, যা ২০২৬ সালে বেড়ে দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১,৮৪০ কোটি ডলারে – বার্ষিক বৃদ্ধির হার প্রায় সাড়ে আট শতাংশ। নবীকরণযোগ্য জ্বালানির প্রসার, গ্রিড পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, সরকারি প্রণোদনা এবং ব্যাটারি-ক্যাপাসিটর প্রযুক্তির উন্নতিকেই এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ওই রিপোর্ট।
ভারতেও ছবিটা উৎসাহব্যঞ্জক। জুলাইয়ে নয়াদিল্লিতে ইন্ডিয়া এনার্জি স্টোরেজ উইক ২০২৬-এ কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ ও নবীকরণযোগ্য জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী শ্রীপাদ ইয়েসো নায়েক জানান, দেশে বর্তমানে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ ব্যবস্থার (BESS) ক্ষমতা প্রায় ৭.৫ গিগাওয়াট-ঘণ্টা, আর নির্মীয়মাণ প্রকল্পের পরিমাণ প্রায় ১৪০ গিগাওয়াট-ঘণ্টা। এর আগে মার্চে দিল্লির যশোভূমিতে এসইএসআই ২০২৬ সম্মেলনে ইন্ডিয়া এনার্জি স্টোরেজ অ্যালায়েন্স (IESA) ও কাস্টমাইজড এনার্জি সলিউশনসের যৌথ শ্বেতপত্রে জানানো হয়েছিল, ২০৩৩ সালের মধ্যে ভারতের মোট ব্যাটারি স্টোরেজ ক্ষমতা পৌঁছতে পারে প্রায় ৩৪৬ গিগাওয়াট-ঘণ্টায়। অ্যাডভান্সড কেমিস্ট্রি সেল (ACC)-এর জন্য ৫০ গিগাওয়াট-ঘণ্টার প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ প্রকল্প, স্ট্যান্ডঅ্যালোন BESS-এর জন্য ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং এবং ২০২৫ সালের বিদ্যুৎ (সংশোধনী) নিয়মে স্টোরেজকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার মতো পদক্ষেপ এই বৃদ্ধিকে গতি দিচ্ছে বলে জানাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার।
এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই সম্প্রতি আইএএসটিডিএল (IASTDL)-এর গবেষণা মঞ্চে একটি সমীক্ষাপত্র প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের গবেষক ডঃ সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর সহযোগী গবেষকরা। ডঃ চট্টোপাধ্যায় গনি খান চৌধুরী ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (GKCIET), মালদহ-র ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, এবং দীর্ঘদিন ধরে পাওয়ার সিস্টেম, বিদ্যুৎ গুণমান ও মাইক্রো-গ্রিড সংক্রান্ত গবেষণায় যুক্ত। তাঁদের সমীক্ষাপত্রে হাইব্রিড এনার্জি স্টোরেজের বিভিন্ন প্রযুক্তি, তাদের কার্যকারিতা এবং একত্রিত করার কৌশল নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। ব্যাটারি ও দ্রুত-সাড়া দেওয়া যন্ত্রের (ক্যাপাসিটর বা ফ্লাইহুইল) মিলিত ব্যবহারে নির্ভরযোগ্যতা বাড়ে, ব্যবস্থার আয়ু বাড়ে এবং সার্বিক খরচ কমে, এমনটাই মত সমীক্ষাটির।
তথ্য সারণি ১: প্রধান শক্তি সঞ্চয় প্রযুক্তির তুলনা
| প্রযুক্তি | শক্তি-ঘনত্ব (Wh/kg) | পাওয়ার-ঘনত্ব (W/kg) | সাড়া দেওয়ার সময় | আনুমানিক চক্র-আয়ু | প্রধান ব্যবহারক্ষেত্র |
|---|---|---|---|---|---|
| লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি | ১৫০ – ২৫০ | ৩০০–১,৫০০ | মিলিসেকেন্ড – সেকেন্ড | ৫০০ – ৬,০০০ | ইভি, গ্রিড স্টোরেজ, বাড়ি-ঘর |
| আল্ট্রা-ক্যাপাসিটর | ৫ – ১৫ | প্রায় ১০,০০০ | মিলিসেকেন্ডের মধ্যে | ৫ লক্ষ + | দ্রুত পাওয়ার বার্স্ট, রিজেনারেটিভ ব্রেকিং |
| ফ্লাইহুইল | ১০ – ৩০ | ১,০০০ – ৫,০০০ | মিলিসেকেন্ডের মধ্যে | কার্যত অসীম | ফ্রিকোয়েন্সি রেগুলেশন, UPS |
| এসএমইএস (SMES) | ১ – ১০ | অত্যন্ত বেশি | মিলিসেকেন্ডেরও কম | কার্যত অসীম | গ্রিড স্থিতিশীলতা, পাওয়ার কোয়ালিটি |
(উপরের পরিসংখ্যান প্রযুক্তি অনুযায়ী প্রচলিত সীমা; নির্দিষ্ট ডিজাইন ও রাসায়নিক গঠনভেদে প্রকৃত মান পরিবর্তিত হতে পারে )
জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা ও ব্রেন্ট ক্রুডের উদ্বেগ
গত কয়েক মাসে ব্রেন্ট ক্রুডের বাজার যে টালমাটাল অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েছে, তা শক্তি নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে আরও জোরালো করে তুলেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ব্রেন্টের দাম ব্যারেল-প্রতি ৬৫-৭২ ডলারের আশপাশে স্থিতিশীল থাকলেও, ফেব্রুয়ারির শেষ ও মার্চে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্নের জেরে দাম এক লাফে প্রায় ১২০ ডলার ছুঁয়ে ফেলে, এক মাসেই প্রায় ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি, বাজার বিশ্লেষকদের মতে যা ১৯৮৮ সালের পর সবচেয়ে বড় মাসিক উত্থান। এপ্রিল-জুলাইয়ে দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও অগস্টের মাঝামাঝি ফের আমেরিকা-ইরান সংঘাত ও রাশিয়ার জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলার জেরে ব্রেন্ট প্রায় ৯৫ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছয়, এক সপ্তাহে সাত শতাংশের বেশি উত্থান।
ভারতের মতো দেশের কাছে এই অস্থিরতার আর্থিক মূল্য বিরাট। পেট্রোলিয়াম প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যানালিসিস সেল (PPAC)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে ভারতের মোট অশোধিত তেল ব্যবহারের ৮৮.৫ শতাংশই এসেছে আমদানি থেকে। ওই একই মাসে দেশের অশোধিত তেল আমদানি বিল দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৩৭০ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি, মূলত আমদানির পরিমাণ ও দাম, দুটোই বাড়ার কারণে। ভারতের মোট পণ্য আমদানি বিলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই আসে অশোধিত তেল থেকে। ফলে ব্রেন্ট ক্রুডের এই ধরনের ঊর্ধ্বগতি সরাসরি প্রভাব ফেলে টাকার বিনিময় মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতির উপরেও।
তথ্য সারণি ২: মূল পরিসংখ্যান এক নজরে
| সূচক | মান |
|---|---|
| বিশ্ব হাইব্রিড এনার্জি স্টোরেজ বাজার (২০২৬) | প্রায় ১,৮৪০ কোটি ডলার (৮.৫% বার্ষিক বৃদ্ধির হার) |
| ভারতের অশোধিত তেল আমদানি নির্ভরতা (জুলাই ২০২৬) | ৮৮.৫% |
| ভারতের অশোধিত তেল আমদানি বিল (জুলাই ২০২৬) | প্রায় ১,৩৭০ কোটি ডলার (বছরে ৪১% বৃদ্ধি) |
| ব্রেন্ট ক্রুডের ২০২৬ সালের সর্বোচ্চ (মার্চ) | প্রায় ১২০ ডলার/ব্যারেল |
| ভারতের বর্তমান ব্যাটারি স্টোরেজ ক্ষমতা (মধ্য-২০২৬) | প্রায় ৭.৫ গিগাওয়াট-ঘণ্টা (আরও ১৪০ গিগাওয়াট-ঘণ্টা নির্মীয়মাণ) |
| ভারতের লক্ষ্যমাত্রা (২০৩৩) | প্রায় ৩৪৬ গিগাওয়াট-ঘণ্টা ব্যাটারি স্টোরেজ (IESA-CES) |
সবুজ শক্তির দিকে এগোনো কেন জরুরি
এই প্রেক্ষাপটে হাইব্রিড এনার্জি স্টোরেজের গুরুত্ব শুধু প্রযুক্তিগত নয়, কৌশলগতও। নায়েক তাঁর বক্তৃতায় জানান, ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থা এখন আর শুধু বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়ের ব্যাকআপ নয়, বরং গ্রিডের নমনীয়তা বজায় রাখার একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠছে, উদ্বৃত্ত নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ শুষে নেওয়া, ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণ, পিক আওয়ারে চাপ কমানো এবং ট্রান্সমিশন লাইনে বিনিয়োগ পিছিয়ে দেওয়ার মতো একাধিক ক্ষেত্রে এর ভূমিকা রয়েছে। হাইব্রিড ব্যবস্থা এই কাজগুলি আরও দক্ষভাবে করতে সাহায্য করে, কারণ তা একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শক্তি সঞ্চয় এবং তাৎক্ষণিক পাওয়ার জোগানো, দুটোই নিশ্চিত করে।
দীর্ঘমেয়াদে দেখলে, শক্তিক্ষেত্রে আমদানি-নির্ভরতা কমানো শুধু জলবায়ু লক্ষ্যপূরণের প্রশ্ন নয়, জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও প্রশ্ন। নবীকরণযোগ্য উৎস ও উপযুক্ত সঞ্চয় প্রযুক্তির মেলবন্ধন যত মজবুত হবে, ব্রেন্ট ক্রুডের মতো আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠাপড়ায় দেশীয় অর্থনীতির ঝুঁকিও ততটাই কমবে।
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
ইন্ডিয়া এনার্জি স্টোরেজ অ্যালায়েন্স (IESA)-র সভাপতি দেবমাল্য সেনের মতে, ভারতের শক্তি সঞ্চয় ক্ষেত্র এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে – টেন্ডারিং পর্ব পেরিয়ে বাস্তবায়নের পালা শুরু হয়েছে, আর আগামী দিনে আসল চ্যালেঞ্জ হবে কম শুল্কের প্রকল্পগুলির জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা। শিল্পক্ষেত্রের পর্যবেক্ষকদের মতে, শুধু প্রকল্প ঘোষণা করলেই হবে না, নির্ধারিত সময়ে সেগুলি বাস্তবে রূপ দেওয়াই এখন আসল পরীক্ষা।
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও কিছু বাধা রয়ে গিয়েছে। ভারত এখনও দেশে ব্যাটারি অ্যাসেম্বল করলেও অধিকাংশ সেল আমদানি করে, মূলত চিন থেকে – ফলে ৫০ গিগাওয়াট-ঘণ্টার অ্যাডভান্সড কেমিস্ট্রি সেল প্রকল্পের মতো উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত অর্থে স্বয়ংসম্পূর্ণ সরবরাহ-শৃঙ্খল গড়ে উঠতে সময় লাগবে। আল্ট্রা-ক্যাপাসিটর বা ফ্লাইহুইলের মতো প্রযুক্তির উৎপাদন খরচও এখনও তুলনায় বেশি, যদিও আগামী দশকে তা ধারাবাহিকভাবে কমার সম্ভাবনা দেখছেন গবেষকরা। ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (BMS), পাওয়ার কনভার্সন সিস্টেম (PCS) এবং এনার্জি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (EMS)-এর মধ্যে সমন্বয় ঠিকভাবে গড়ে তোলাই হাইব্রিড ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় কারিগরি চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, ডঃ চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর সহ-গবেষকদের সাম্প্রতিক সমীক্ষাপত্রেও মূলত এই সমন্বয়-কৌশল নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে।
‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র হাত ধরে নাগালে আসছে দাম
এতদিন মূলত বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভরশীল থাকলেও, বর্তমানে দেশীয় উদ্যোগেই তৈরি হচ্ছে উচ্চ ক্ষমতার এই এনার্জি স্টোরেজ ডিভাইস। ইসরো (ISRO)-র কারিগরি সহায়তায় কেরালার কেলট্রন (Keltron) সম্প্রতি দেশে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে সুপারক্যাপাসিটর উৎপাদন শুরু করেছে। তাদের কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ৩৬,০০০ ইউনিট তৈরি হচ্ছে। পিছিয়ে নেই বেসরকারি খাতও। হায়দ্রাবাদের কোম্পানি ‘গোডি ইন্ডিয়া’ (GODI India) সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করেছে ৩০০০ ফ্যারাড (3000F)-এর হাই-পাওয়ার সুপারক্যাপাসিটর, যা ইভি শিল্পে গেমচেঞ্জার হতে পারে।
খুচরো বাজার ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো ঘুরে দেখা যাচ্ছে, ক্যাপাসিটির ওপর ভিত্তি করে দামের বেশ তারতম্য রয়েছে। ছোট প্রজেক্ট বা মেমরি ব্যাকআপের জন্য ব্যবহৃত লো-ক্যাপাসিটি সুপারক্যাপাসিটরগুলি (যেমন ৩.৩ μF বা ১০F) মিলছে মাত্র ১০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যেই।অন্যদিকে, বড় এনার্জি স্টোরেজের জন্য ব্যবহৃত হাই-ক্যাপাসিটি মডেলগুলির (যেমন ৫০০F) দাম শুরু হচ্ছে ১,২০০ থেকে ২,৫০০ টাকার কাছাকাছি। আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেডের মেগা মডিউলগুলির দাম ক্যাপাসিটি অনুযায়ী ৩০,০০০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় উৎপাদন এভাবেই বাড়তে থাকলে আগামীতে সুপারক্যাপাসিটরের দাম আরও কমবে এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে ব্যাটারির পাশাপাশি এর ব্যবহার এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
সব মিলিয়ে, হাইব্রিড এনার্জি স্টোরেজ কোনও একক জাদু-সমাধান নয়, বরং একাধিক প্রযুক্তির পরিপূরক ব্যবহারের মাধ্যমে শক্তি ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী করে তোলার একটি বাস্তবসম্মত পথ। বিশ্ব বাজারের দ্রুত বৃদ্ধি এবং ভারতের নীতিগত উদ্যোগ থেকে স্পষ্ট, আগামী দশকে এই প্রযুক্তি শক্তিক্ষেত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠতে চলেছে। তবে ব্রেন্ট ক্রুডের মতো বিশ্ব বাজারের অনিশ্চয়তা যতদিন থাকবে, ততদিন এই ধরনের সঞ্চয় প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ও গবেষণার গুরুত্ব শুধু বাড়তেই থাকবে, বিশেষত ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য।
তথ্যসূত্র: পেট্রোলিয়াম প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যানালিসিস সেল (PPAC); ইন্ডিয়া এনার্জি স্টোরেজ অ্যালায়েন্স (IESA) ও কাস্টমাইজড এনার্জি সলিউশনস-এর যৌথ শ্বেতপত্র, মার্চ ২০২৬; দ্য বিজনেস রিসার্চ কোম্পানি, Hybrid Energy Storage Global Market Report 2026; মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (EIA) ও ট্রেডিং ইকোনমিক্স-এর ব্রেন্ট ক্রুড মূল্য তথ্য; কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রক; IASTDL (Vol. 1, Issue 2)-এ প্রকাশিত সমীক্ষাপত্র।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
