Site icon Jist Feed

GKCIET এখন ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়: উত্তরবঙ্গের প্রযুক্তি শিক্ষায় নতুন যুগ

GKCIET

এতদিন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রকের অর্থানুকূল্যে চলা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান (CFTI) হিসেবেই পরিচিত ছিল প্রতিষ্ঠানটি। এবার সেই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি। ঘোষণা সামনে আসতেই ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগী মহলে খুশির হাওয়া। আগামী সপ্তাহে বোর্ড অফ গভর্নর্সের বৈঠকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন। সিনিয়র ব্যাচের ডিগ্রি নিয়েও আশ্বাস।

নিজস্ব প্রতিবেদন : উত্তরবঙ্গের প্রযুক্তি শিক্ষায় জুড়ল নতুন অধ্যায়। মালদহের নারায়ণপুরে অবস্থিত গণিখান চৌধুরী ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (GKCIET)-কে ডিমড-টু-বি ইউনিভার্সিটি হিসেবে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রক। এতদিন কেন্দ্রীয় অর্থানুকূল্যে চলা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান (CFTI) হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বিজ্ঞপ্তি হাতে আসার পর আজ ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও কর্মীদের সামনে বক্তব্য রাখেন ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর প্রফেসর সিবি জন। ডিরেক্টর জানান, বিজ্ঞপ্তি এসেছে প্রত্যাশিত পথেই। তাঁর কথায়, শিক্ষামন্ত্রক ইনস্টিটিউটকে একটি “স্ট্যান্ডার্ড ডিমড-টু-বি ইউনিভার্সিটি” হিসেবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। এর অর্থ, একাডেমিক মান, শৃঙ্খলা এবং প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় কার্যকলাপ দেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রকের ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে হবে।

তিনি আরও বলেন:

কবে থেকে এই নির্দেশ কার্যকর ?

ডিরেক্টর স্পষ্ট করেছেন, বিজ্ঞপ্তি ইনস্টিটিউটের হাতে এসে পৌঁছেছে। তবে আগামী সপ্তাহে বোর্ড অফ গভর্নর্সকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে এবং তাঁদের অনুমোদন নিয়েই বিষয়টি কার্যকর করা হবে। অর্থাৎ বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

পড়ুয়াদের উদ্বেগ

অনুষ্ঠানে একাধিক ছাত্রছাত্রী, বিশেষত প্রথম বর্ষ ও সিনিয়র ব্যাচের একাংশ, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ জানান। ডিরেক্টরের জবাবের সারকথা নিচের টেবিলে:

পড়ুয়াদের ব্যাচডিরেক্টরের বক্তব্য অনুযায়ী পরিস্থিতি
জুনিয়র / সাম্প্রতিক ব্যাচবিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা তুলনামূলক সহজ হবে বলে মনে করছে ইনস্টিটিউট
সিনিয়র ব্যাচমূল্যায়ন ও একাডেমিক নথির একাংশ বর্তমান অধিভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে থাকায় প্রক্রিয়া সহজ নয়; সেগুলি ইনস্টিটিউটের দিকে ফিরিয়ে এনে এগোতে হবে
বিকল্প পরিকল্পনাএই সেশনেই সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা হবে; না হলে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ থেকে ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হবে

ডিরেক্টর আশ্বাস দিয়েছেন, ইনস্টিটিউটের পক্ষে “যত কষ্টই হোক”, এই সেশনেই বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে মেটানোর চেষ্টা করা হবে।

একনজরে: আগে ও পরে

বিষয়আগে (CFTI হিসেবে)এখন (ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়)
ডিগ্রি প্রদানB.Tech-এ MAKAUT-এর মাধ্যমেনিজস্ব ডিগ্রি প্রদানের অধিকার
পাঠ্যক্রমবিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত কাঠামোনিজস্ব পাঠ্যক্রম তৈরির স্বাধীনতা
পরীক্ষা ব্যবস্থাঅধিভুক্ত কাঠামো অনুযায়ীস্বতন্ত্র পরীক্ষা ও মূল্যায়ন
গবেষণাসীমিত পরিসরস্বতন্ত্র গবেষণা ও অনুদানের বাড়তি সুযোগ
ডিপ্লোমা কোর্সWBSCT&VE&SD অধিভুক্তকাঠামো পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা
জবাবদিহিমন্ত্রকের নির্দেশনায়শিক্ষামন্ত্রকের উচ্চশিক্ষা-নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্ট্যান্ডার্ড ডিমড বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে

অ্যাডমিশনে কী বদল ?

বর্তমানে B.Tech-এ ভর্তি হয় JoSAA/CSAB (JEE Main র‍্যাঙ্কের ভিত্তিতে) এবং রাজ্যস্তরে WBJEE-র মাধ্যমে। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (AI ও ML), ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এবং ফুড টেকনোলজিতে পড়ানো হয়। ডিমড মর্যাদার পর ভর্তি-পদ্ধতি বা আসন-কাঠামো য় বদল হবে কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা।

দেশের কোন কোন প্রতিষ্ঠান এই পথে

প্রতিষ্ঠানঅবস্থানবৈশিষ্ট্য
সন্ত লঙ্গোয়াল ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (SLIET)সঙ্গরুর, পাঞ্জাবকেন্দ্রীয় অর্থানুকূল্যে চলা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়
রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ এডুকেশনাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট (RKMVERI)বেলুড়, পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ
ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট (ISI)কলকাতাজাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান, নিজস্ব ডিগ্রি প্রদান
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (IIEST)শিবপুর, হাওড়াজাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান, নিজস্ব ডিগ্রি প্রদান

কি কি সুবিধা পাওয়া যাবে ?

১. স্বায়ত্তশাসনের সুফল: পাঠ্যক্রমের নমনীয়তাই ডিমড মর্যাদার সবচেয়ে বড় সুবিধা। শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী AI-ML, গ্রিন টেকনোলজি ও ফুড প্রসেসিংয়ের মতো ক্ষেত্রে কোর্স বদলানো যাবে দ্রুত। মালদহের কৃষি-অর্থনীতির সঙ্গে ফুড টেকনোলজি বিভাগের সংযোগ গড়ার সুযোগও থাকছে।

২. গবেষণা ও অনুদান: স্বতন্ত্র গবেষণা কর্মসূচি ও পিএইচডি চালুর সুযোগ তৈরি হলে কেন্দ্রীয় গবেষণা সংস্থা ও শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে যৌথ প্রকল্পের পথ খুলতে পারে।

৩. “ট্রানজিশন” সবচেয়ে বড় পরীক্ষা: ডিরেক্টরের নিজের বক্তব্যেই স্পষ্ট, কাঠামো বদলের সময় সিনিয়র ব্যাচের ডিগ্রি ও নথির প্রশ্নটি সবচেয়ে সংবেদনশীল। অধিভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (MAKAUT)-র সঙ্গে সমন্বয় এবং স্পষ্ট লিখিত নির্দেশিকা প্রকাশ করাই পড়ুয়াদের উদ্বেগ কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে।

৪. দায়বদ্ধতার চাপ: “স্ট্যান্ডার্ড ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়” তকমার অর্থ, মান, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের নজর থাকবে। শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণা পরিকাঠামো ও মূল্যায়ন-স্বচ্ছতায় নেতৃত্বের দক্ষতাই হবে নির্ণায়ক।

৫. আঞ্চলিক ভারসাম্য: রাজ্য সরকার সম্প্রতি উত্তরবঙ্গে পরিকাঠামো-উন্নয়নে জোর দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি স্বশাসিত প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হলে প্রতিভা পলায়ন কমার সম্ভাবনা বাড়ে।

ভাষণে ডিরেক্টর শিক্ষামন্ত্রক-সহ এই প্রচেষ্টায় যাঁরা পাশে ছিলেন, সবাইকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, প্রক্রিয়া চলাকালীন অনেকে “এটা সম্ভব নয়” বলেছিলেন এবং কেউ কেউ ইনস্টিটিউটের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও জানিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, সেই সমালোচনা ও অভিযোগই নিজেদের শুধরে নেওয়ার এবং মন্ত্রকের সামনে অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ করে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ফল “মধুর ও স্মরণীয়”, এমনটাই দাবি তাঁর।

কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়: “ডাবল ইঞ্জিন”-এর প্রত্যাশা

এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয়ের প্রসঙ্গও উঠে আসছে। কেন্দ্র এবং রাজ্য, দু’জায়গাতেই এখন একই রাজনৈতিক জোটের সরকার, যাকে শাসক শিবির “ডাবল ইঞ্জিন সরকার” বলে অভিহিত করে থাকে। শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, এই সমন্বয় জমি, পরিকাঠামো, যোগাযোগ ও অনুমোদনের মতো বিষয়গুলিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের প্রতি কেন্দ্রের ইতিবাচক ভূমিকার দৃষ্টান্ত হিসেবে এই বিজ্ঞপ্তিকে তুলে ধরছেন সমর্থকেরা। উত্তরবঙ্গে রাজ্য সরকারের চলমান পরিকাঠামো-উন্নয়নের সঙ্গে একটি কেন্দ্রীয় মর্যাদাসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হলে এই অঞ্চলের উন্নয়নের গতি বাড়বে বলে প্রত্যাশা।

ঘরের ছেলে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী: এই প্রেক্ষাপটে আরও একটি বিষয় আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ডঃ সুকান্ত মজুমদারএই অঞ্চলেরই মানুষ। তিনি দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটের সাংসদ এবং রাজনীতিতে আসার আগে মালদহের গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। উত্তরবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ ধারণা থাকায় ইনস্টিটিউটের পরবর্তী ধাপগুলিতে, যেমন চেয়ারম্যান নিয়োগ, অনুদান ও পরিকাঠামো সম্প্রসারণে, মন্ত্রকে বিষয়টি আরও জোরালোভাবে উঠে আসবে বলে আশা করছেন শিক্ষাবিদরা।

শূন্য চেয়ারম্যান পদ: নজর এখন সেদিকে

প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদটি বর্তমানে শূন্য এবং নিয়োগ-প্রক্রিয়া শিক্ষামন্ত্রকে বিবেচনাধীন। নতুন মর্যাদার প্রেক্ষাপটে এই নিয়োগের গুরুত্ব বহুগুণ। ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষাবিদরা এমন একজন দূরদর্শী, অভিজ্ঞ নেতৃত্ব চান, যিনি—

পরবর্তী ধাপ কী ?

  1. আগামী সপ্তাহে বোর্ড অফ গভর্নর্সের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন।
  2. সিনিয়র ব্যাচের ডিগ্রি ও মূল্যায়নের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয়।
  3. প্রয়োজনে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ থেকে ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালু।
  4. চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে মন্ত্রকের সিদ্ধান্ত।

পশ্চিমবঙ্গে, এমনকি দেশেও, ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাপ্রাপ্ত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হাতে গোনা। এই স্বীকৃতি উত্তরবঙ্গের প্রযুক্তি-শিক্ষার আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। এখন দেখার বিষয়, স্বচ্ছ পরিকল্পনা, সঠিক নেতৃত্ব ও দ্রুত বাস্তবায়নে এই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যায়।

Exit mobile version