২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারির পর বিশ্ব যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছে, ঠিক সেই সময় আবারও একটি বিরল কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক ভাইরাস আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে। দক্ষিণ আমেরিকার উৎস থেকে ছড়িয়ে পড়া “অ্যান্ডিস হান্টাভাইরাস” এবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজ MV Hondius-কে ঘিরে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা World Health Organization বর্তমানে পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে। যদিও WHO এখনই বিশ্বব্যাপী ঝুঁকিকে “খুব কম” বলে মনে করছে, তবুও ঘটনাটি আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। কারণ এই ভাইরাসের যে স্ট্রেনটি শনাক্ত হয়েছে—“অ্যান্ডিস স্ট্রেন”—তা পৃথিবীর একমাত্র হান্টাভাইরাস, যা মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম।
কী এই হান্টাভাইরাস ?
হান্টাভাইরাস সাধারণত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর শরীর থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। সংক্রমিত ইঁদুরের মূত্র, লালা অথবা মল শুকিয়ে বাতাসে মিশে গেলে মানুষ শ্বাসের মাধ্যমে আক্রান্ত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত স্থানে স্পর্শ করার পর হাত না ধুয়ে মুখ বা নাক স্পর্শ করলেও সংক্রমণ হতে পারে।
এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রথমদিকে সাধারণ ফ্লু-এর মতো উপসর্গ দেখা যায়—
- জ্বর
- মাথাব্যথা
- বমি বা ডায়রিয়া
- শরীরে ব্যথা
- দুর্বলতা
কিন্তু পরে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। রোগীর ফুসফুসে তরল জমে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং নিউমোনিয়ার মতো মারাত্মক অবস্থা তৈরি হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে রোগীকে আইসিইউতে ভর্তি করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হান্টাভাইরাসে মৃত্যুহার কোভিড-১৯-এর তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। কিছু স্ট্রেনে মৃত্যুহার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। তবে কোভিডের মতো এটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে না। ফলে ব্যাপক মহামারি হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।
কীভাবে শুরু হল MV Hondius-এর সংকট ?
MV Hondius ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া বন্দর থেকে ৩৩ দিনের এক ট্রান্স-আটলান্টিক যাত্রা শুরু করে। জাহাজটিতে ১৪৭ জন যাত্রী ও ক্রু ছিলেন। অধিকাংশ যাত্রী ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা ও নিউজিল্যান্ডের নাগরিক।
যাত্রার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় এক প্রবীণ ডাচ পর্যটকের জ্বর, ডায়রিয়া ও মাথাব্যথা শুরু হয়। পরে তাঁর স্ত্রীও অসুস্থ হয়ে পড়েন। কয়েকদিনের মধ্যেই দু’জনের মৃত্যু হয়। পরে আরও এক জার্মান যাত্রীর মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
তদন্তে উঠে আসে, ওই ডাচ দম্পতি ক্রুজে ওঠার আগে কয়েক মাস ধরে আর্জেন্টিনা, চিলি ও উরুগুয়ে সফর করেছিলেন। উশুয়াইয়ার কাছে একটি বার্ডওয়াচিং ট্যুরে তাঁরা অংশ নেন। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে সংক্রমিত ইঁদুরের সংস্পর্শে এসেই তাঁরা ভাইরাসে আক্রান্ত হন।
বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ, জাহাজের সীমিত ও ঘনিষ্ঠ পরিবেশে পরে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটে।
বিশ্বজুড়ে শুরু জরুরি অভিযান
পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় স্পেনের টেনেরিফ দ্বীপে জাহাজটিকে বিশেষ নজরদারিতে আনা হয়। একাধিক দেশের স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক ও জরুরি পরিষেবা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালায়।
প্রায় ৯৪ জন যাত্রী ও ক্রুকে বিশেষ বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়। মোট আটটি চার্টার্ড ফ্লাইট ব্যবহার করা হয়। শেষ পর্যায়ে চারজন অস্ট্রেলীয়, একজন ব্রিটিশ-অস্ট্রেলীয় ও একজন নিউজিল্যান্ডের নাগরিককে নিরাপদে নামানো হয়।
এরপর জাহাজটি নেদারল্যান্ডসের রটারডামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সেখানে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্তকরণ বা ডিসইনফেকশন করা হবে। জাহাজে এখন সীমিত সংখ্যক ক্রু, একজন চিকিৎসক ও একজন নার্স রয়েছেন।
WHO কী বলছে ?
World Health Organization জানিয়েছে—
- এখনও পর্যন্ত মোট ৯টি কেস শনাক্ত হয়েছে
- ৭টি কেস নিশ্চিত
- ২টি সন্দেহভাজন
- ৩ জন মারা গেছেন
- অন্তত একজন আইসিইউতে ভর্তি
WHO বর্তমানে ৪২ দিনের “অ্যাকটিভ মনিটরিং” বা নিবিড় পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। কারণ অ্যান্ডিস হান্টাভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড অনেক দীর্ঘ। উপসর্গ দেখা দিতে ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সংস্থাটি বলেছে, আপাতত আন্তর্জাতিক ভ্রমণে কোনও নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন নেই। তবে আক্রান্তদের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা প্রত্যেককে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
বিভিন্ন দেশ কীভাবে পরিস্থিতি সামলাচ্ছে ?
অস্ট্রেলিয়া: “কোভিড স্তরের” সতর্কতা
অস্ট্রেলিয়া সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। দেশটি হান্টাভাইরাসকে “Listed Human Disease” হিসেবে ঘোষণা করেছে।
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের নাগরিকদের পার্থের কাছে Bullsbrook Centre for National Resilience-এ কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। সেখানে কমপক্ষে ২১ দিনের বাধ্যতামূলক আইসোলেশন চলছে। পরে পরিস্থিতি অনুযায়ী বাড়িতে পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সরকার বিশেষ সামরিক বিমান ব্যবহার করে যাত্রীদের সরাসরি কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্রে নিয়ে গেছে যাতে সাধারণ মানুষের সংস্পর্শ না ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্র: বাড়িভিত্তিক পর্যবেক্ষণ
Centers for Disease Control and Prevention আক্রান্ত ও সম্ভাব্য আক্রান্ত মার্কিন নাগরিকদের জন্য আলাদা পরিকল্পনা করেছে।
যাঁদের উপসর্গ রয়েছে, তাঁদের বিশেষ বায়োকনটেইনমেন্ট ইউনিটে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদের ৪২ দিনের হোম মনিটরিংয়ে রাখা হয়েছে। প্রতিদিন শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা ও স্বাস্থ্য রিপোর্ট জমা দিতে হচ্ছে।
কোভিড-১৯-এর চেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর?
এই প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হান্টাভাইরাস কোভিড-১৯-এর মতো দ্রুত ছড়ায় না। তাই বিশ্বব্যাপী মহামারির ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কিন্তু একবার গুরুতর সংক্রমণ হলে মৃত্যুহার অনেক বেশি হতে পারে।
কোভিডে যেখানে অধিকাংশ মানুষ সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন, সেখানে হান্টাভাইরাসের গুরুতর রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হল—এই ভাইরাস সাধারণ সামাজিক মেলামেশা বা বাতাসে সহজে ছড়ায় না।
সাধারণ মানুষ কীভাবে সতর্ক থাকবেন ?
WHO কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে—
- নিয়মিত হাত ধোয়া
- ইঁদুর বা ইঁদুরের মল-মূত্র এড়িয়ে চলা
- বন্ধ জায়গায় ভালো বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা
- জ্বর বা শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
- অসুস্থ অবস্থায় অন্যদের থেকে দূরে থাকা
MV Hondius-এর এই ঘটনা বিশ্বকে আবার মনে করিয়ে দিল, সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কখনও পুরোপুরি শেষ হয় না। আধুনিক চিকিৎসা ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের ফলে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন—বন্যপ্রাণী ও মানুষের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ভবিষ্যতে আরও নতুন সংক্রমণের পথ খুলে দিতে পারে।
বিশ্ব হয়তো এখনও কোভিডের স্মৃতি ভুলতে পারেনি। সেই প্রেক্ষাপটে হান্টাভাইরাসের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল—জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা এখন আর কোনও একটি দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি পুরো বিশ্বের সমস্ত মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত ।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
