জেরক্সের ছোট দোকানেই এখন জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন পান্ডুয়ার পর্বতারোহী সুমিত দাস
শুভজিৎ বসু: হাত ও পায়ের কুড়িটি আঙুলই হারিয়েছেন। তবুও জীবনযুদ্ধ থামিয়ে দেননি। পান্ডুয়ার তিন্না বাজারে একটি ছোট জেরক্সের দোকান চালিয়ে কোনওরকমে সংসার টিকিয়ে রেখেছেন পর্বতারোহী সুমিত দাস।
ঘটনার আট বছর পেরিয়ে গেছে। শরীরের ক্ষত অনেকটাই শুকিয়েছে, কিন্তু মনের ক্ষত আজও তাজা। পর্বত জয়ের স্বপ্ন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুব কল্যাণ দপ্তরের অধীনে পরিচালিত ওয়েস্ট বেঙ্গল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস ফেডারেশনের একটি অভিযানে অংশ নিতে আবেদন করেছিলেন তিনি।
২০১৭ সালে যুব কল্যাণ দপ্তরের পক্ষ থেকে ‘সুদর্শন অভিযান’-এর জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেই বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করেন পান্ডুয়ার তিন্না গ্রামের তরুণ পর্বতারোহী সুমিত দাস (বর্তমানে ৩১)। তাঁর দাবি, পর্বতারোহণে পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তাঁকে ওই অভিযানের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল।
অভিযানকারী দলের সদস্যদের সল্টলেক স্টেডিয়ামে ডাকা হয়। সেখানে জানানো হয়, সুদর্শন পর্বত অভিযানের জন্য তাঁদের নির্বাচন করা হয়েছে। কিন্তু ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে অভিযানে রওনা দেওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে তাঁদের জানানো হয়, সুদর্শন অভিযানের পরিবর্তে উত্তরাখণ্ডের শ্রীকৈলাস পর্বত অভিযানে যেতে হবে।
এরপর অক্টোবর মাসেই অভিযাত্রী দল শ্রীকৈলাসের উদ্দেশে রওনা দেয়। তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে এই অভিযানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন।
সুমিতের অভিযোগ, ২২,৭৪৪ ফুট উচ্চতার শ্রীকৈলাস অভিযানের জন্য যে জ্যাকেট, উলের মোজা, জুতো, গ্লাভস, স্লিপিং ব্যাগ, তাঁবু এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়া হয়েছিল, সেগুলির মান ছিল অত্যন্ত নিম্নস্তরের। তাঁর কথায়, যথাযথ মানের সরঞ্জাম সরবরাহ করা হলে হয়তো আজ হাত-পায়ের আঙুলগুলি অক্ষত থাকত।
পর্বতারোহণের প্রতি সুমিতের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। ২০১২ সাল থেকে তিনি এই খেলায় যুক্ত। ২০১৩ সালে হিমাচল প্রদেশের সিভি-১৩ শৃঙ্গে আরোহণ করেন। পরে ২০১৫-১৬ সালে দার্জিলিংয়ের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণও নেন। স্বপ্ন ছিল একজন দক্ষ ও প্রতিষ্ঠিত পর্বতারোহী হওয়ার।
কিন্তু শ্রীকৈলাস অভিযান তাঁর জীবনে ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন হয়ে নেমে আসে। অভিযানের পর গুরুতর শীতজনিত ক্ষতির (Frostbite) কারণে হাত ও পায়ের সব আঙুলই হারাতে হয় তাঁকে।
আজ সেই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বুকে নিয়েই পান্ডুয়ার তিন্না বাজারে একটি ছোট জেরক্সের দোকান চালান সুমিত দাস। প্রতিদিনের সংগ্রামে তিনি এগিয়ে চলেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর অভিযোগ, যে গাফিলতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে তাঁর জীবনে এই বিপর্যয় নেমে এসেছিল, তার বিচার আজও মেলেনি।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
