যজ্ঞবেদীর রক্ষাসূত্র কীভাবে হয়ে উঠল জাতীয় ঐক্যের প্রতীক – ইতিহাস, পুরাণ ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতার বিশ্লেষণ
বিশেষ প্রতিবেদন: আগামী ২৮ আগস্ট, শুক্রবার, শ্রাবণী পূর্ণিমার সকালে সারা দেশে পালিত হবে রাখীবন্ধন। সেই উপলক্ষেই ফিরে দেখা এই উৎসবের সুদীর্ঘ ইতিহাস, পুরাণ-মহাকাব্যের আখ্যান এবং আজকের ভারতে তার নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার কাহিনি।
শ্রাবণী পূর্ণিমার সকালে একটি রঙিন সুতো যখন কব্জিতে জড়িয়ে ধরে, তখন তা নিছক উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা থাকে না। হাজার বছরের ইতিহাস, পুরাণ, মহাকাব্য আর জাতীয় আন্দোলনের স্মৃতি সেই সুতোয় গাঁথা থাকে। রাখীবন্ধন তাই বাংলা তথা গোটা ভারতের সাংস্কৃতিক জীবনে এক অনন্য অধ্যায়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রূপ বদলেছে, কিন্তু যার মূল সুর, রক্ষা, প্রতিশ্রুতি ও ঐক্য, আজও অক্ষুণ্ণ।
বেদ ও পুরাণে রাখীর উৎসসন্ধান
বৈদিক ঋষিরা যজ্ঞবেদী রক্ষার জন্য তার চারপাশে সূত্র বেঁধে দিতেন, রাখী বন্ধনের শিকড় খুঁজতে গেলে প্রথমেই পৌঁছে যেতে হয় এই বৈদিক প্রথায়। পরবর্তী পৌরাণিক যুগে এই ধারা রূপান্তরিত হয় দেবদেবীর প্রতিমা ঘিরে তীরকাঠিতে লাল সূত্র বাঁধার রীতিতে। দেবতার হাতে বা ঘটে লালসূত্র বেঁধে নানাবিধ অলৌকিক বিঘ্ন থেকে রক্ষার যে ব্যবস্থা নেওয়া হত, তার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল আজকের রাখী বন্ধনের প্রথম বীজ।
ভবিষ্য পুরাণ অনুযায়ী, দেবাসুরের যুদ্ধে দেবতাদের রক্ষার জন্য নারদ মুনি তাঁদের হাতে রাখী বেঁধে দিয়েছিলেন, আধুনিক কালের বিপত্তারিণী ব্রতকে এরই একটি রূপান্তরিত সংস্করণ বলে মনে করা হয়।
সবচেয়ে জনপ্রিয় পৌরাণিক আখ্যানটি অবশ্য দৈত্যরাজ বলিকে নিয়ে। বামন অবতারে বিষ্ণু ছলনার আশ্রয়ে বলির কাছ থেকে ত্রিভুবন হরণ করে তাঁকে পাতালে পাঠিয়ে দেন। এই মহৎ দানের বিনিময়ে বর দিতে চাইলে বলি বিষ্ণুকে পাতালে নিজের সঙ্গে থাকার অনুরোধ জানান, আর বিষ্ণু বাধ্য হয়ে তা রক্ষা করেন। এই পরিস্থিতিতে বিরহিণী লক্ষ্মী ব্রাহ্মণীর ছদ্মবেশে শ্রাবণী পূর্ণিমার দিন বলির প্রাসাদে গিয়ে তাঁর হাতে রাখী বেঁধে দেন, নিজের পরিচয় জানিয়ে বিষ্ণুকে ফিরিয়ে দেওয়ার আর্জি জানান। বলি সেই আর্জি রক্ষা করেন, পুরাণবিদদের মতে, এই ঘটনা থেকেই রাখী বন্ধন উৎসবের সূচনা।
আরেকটি কাহিনিতে দেখা যায়, দেবরাজ ইন্দ্র বৃত্রাসুরকে বধ করতে ব্যর্থ হলে দেবগুরু বৃহস্পতির নির্দেশে ইন্দ্রপত্নী শচী মন্ত্রপূত সূত্রগুচ্ছ শুদ্ধ চিত্তে স্বামীর হাতে বেঁধে দেন, আর তার পরই যুদ্ধে ইন্দ্রের জয় আসে।
মহাকাব্যের পাতায় রক্ষাসূত্র
মহাভারতে মাতা কুন্তী স্বপ্নজাত পুত্র কর্ণকে রাখী বেঁধে জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, মায়ের সেই রক্ষাসূত্রই আগলে রাখে পুত্রকে। মাতা যশোদাও শ্রীকৃষ্ণের মঙ্গল কামনায় রাখীবন্ধন পালন করেন। রামায়ণেও এই রীতির ছাপ স্পষ্ট, সুগ্রীব, হনুমান ও অন্য বানর-প্রধানদের সঙ্গে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে রামচন্দ্র তাঁদের হাতে পুষ্পডোর বেঁধে দিয়েছিলেন।
ইতিহাসের পাতাতেও রাখী
পুরাণ-মহাকাব্য ছাড়িয়ে রাখী বন্ধন জায়গা করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতাতেও। জনশ্রুতি আছে, গ্রিকবীর আলেকজান্ডারের স্ত্রী রাজা পুরুর বিশাল সৈন্যবলের কথা শুনে স্বামীর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পুরুর কাছে রাখী পাঠিয়েছিলেন, আর যুদ্ধক্ষেত্রে পুরু আলেকজান্ডারকে আঘাত করা থেকে বিরত থেকেছিলেন।
মধ্যযুগে চিতোরের রানি কর্ণাবতী গুজরাতের নবাব বাহাদুর শাহের আক্রমণের মুখে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে সম্রাট হুমায়ুনকে রাখী পাঠান। হুমায়ুন সসৈন্যে সুদূর বাংলা থেকে চিতোরের পথে রওনা হলেও পৌঁছনোর আগেই রানি কর্ণাবতী জহরব্রত পালন করেন। তবু ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে রাখির মর্যাদা ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আজও রয়ে গিয়েছে এই ঘটনা।
স্বাধীনতা আন্দোলনে রাখী: তিলক থেকে রবীন্দ্রনাথ
বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় রাখীবন্ধন নিছক পারিবারিক-ধর্মীয় আচার থেকে একধাপ এগিয়ে জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সংঘবদ্ধ করতে লোকমান্য তিলক গোটা ভারতে রাখী বন্ধনের প্রচলন ছড়িয়ে দেন।
আর বাংলার মাটিতে এই উৎসবকে সবচেয়ে গভীর তাৎপর্য দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বঙ্গভঙ্গ রদ করার আন্দোলনে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি রাখী বন্ধনকে হাতিয়ার করেছিলেন। পরস্পরের হাতে রাখি বেঁধে সেদিন বাংলা যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নজির তৈরি করেছিল, তার জোরেই বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়া রুখে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।
এক নজরে রাখীবন্ধনের কাহিনি-পরিক্রমা
| যুগ | কাহিনি/ঘটনা | মূলচরিত্র | তাৎপর্য |
| বৈদিক যুগ | যজ্ঞবেদী রক্ষার সূত্রবন্ধন | ঋষিকুল | রক্ষাকবচ হিসেবে সূত্রের সূচনা |
| পৌরাণিক যুগ | ভবিষ্য পুরাণ | নারদ, দেবতারা | দেবাসুর যুদ্ধে সুরক্ষা |
| পৌরাণিক যুগ | বামন অবতার | বলি, বিষ্ণু, লক্ষ্মী | প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও ভ্রাতৃত্ব |
| পৌরাণিক যুগ | ইন্দ্র-বৃত্রাসুর যুদ্ধ | ইন্দ্র, শচী, বৃহস্পতি | মন্ত্রপূত সূত্রে বিজয় |
| মহাভারত | কর্ণের জন্মকথা | কুন্তী, কর্ণ | মাতৃস্নেহের রক্ষাসূত্র |
| মহাভারত | কৃষ্ণের বাল্যকাল | যশোদা, কৃষ্ণ | কল্যাণ কামনা |
| রামায়ণ | বানরসেনার সঙ্গে মৈত্রী | রাম, সুগ্রীব, হনুমান | বন্ধুত্বের প্রতীক পুষ্পডোর |
| প্রাচীন ইতিহাস | ভারত অভিযান | আলেকজান্ডার, রাজা পুরু | শত্রুশিবিরেও রাখির মর্যাদা |
| মধ্যযুগ | চিতোর আক্রমণ | রানি কর্ণাবতী, হুমায়ুন | রক্ষা ও ভ্রাতৃত্ব |
| ১৯০৫ | বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | জাতীয়তা বোধের উন্মেষ |
| স্বাধীনতা আন্দোলন | ব্রিটিশ বিরোধী সংহতি | লোকমান্য তিলক | সর্বভারতীয় ঐক্য |
আধুনিক ভারতে রাখীবন্ধনের প্রাসঙ্গিকতা: সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির সুতো
একবিংশ শতাব্দীর ভারত ভাষা, ধর্ম, জাতপাত ও আঞ্চলিকতার বিপুল বৈচিত্র্যে ভরা এক দেশ। এই বৈচিত্র্যই ভারতের শক্তি, আবার একই সঙ্গে সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে তা একটি চ্যালেঞ্জও বটে। ঠিক এই জায়গাতেই রাখী বন্ধনের মতো উৎসবের প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়ে যায়। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও আজ বহু মানুষ প্রতিবেশী, বন্ধু, এমনকি সীমান্তে কর্মরত জওয়ানদের হাতেও রাখী বেঁধে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করেন। পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে গাছের গায়ে রাখী বাঁধার রীতিও বিভিন্ন শহরে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও রাখীবন্ধনের গুরুত্ব কম নয়। সারা দেশে ছোট কারিগর, হস্তশিল্পী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে শ্রাবণ মাস একটি বড় বাণিজ্যিক মরসুম, রাখী তৈরি ও বিক্রি থেকে শুরু করে মিষ্টি ও উপহারের বাজার, সব মিলিয়ে বহু মানুষের জীবিকা জড়িয়ে থাকে এই উৎসবের সঙ্গে। রাখী বন্ধন তাই শুধু আবেগের নয়, সামাজিক সমৃদ্ধিরও একটি ক্ষুদ্র অথচ তাৎপর্যপূর্ণ অনুষঙ্গ।
আরএসএস ও সর্বজনীন রাখী উৎসব: সামাজিক সমরসতার প্রয়াস
ভারতের বৃহত্তম সামাজিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) যে বিশেষ ছয়টি উৎসব পালনকরে তার অন্যতম হলো এই রাখীবন্ধন। গত কয়েক দশকে রাখীবন্ধনকে সামাজিক সম্প্রীতির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা আরও জোরালো হয়েছে। আরএসএস এবং তার অনুসারী সংগঠনগুলি ‘সামাজিক সমরসতা’ নামে একটি কর্মসূচিকে দীর্ঘদিন ধরে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে, যার ঘোষিত লক্ষ্য জাতপাতের বিভাজন ঘুচিয়ে হিন্দু সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। সংগঠনের শতবর্ষ উপলক্ষে ঘোষিত ‘পঞ্চ পরিবর্তন’ কর্মসূচিতেও সামাজিক সমরসতা অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এই কর্মসূচির অঙ্গ হিসেবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বস্তি এলাকা বা প্রান্তিক জনবসতিতে জাতপাত-ধর্ম নির্বিশেষে রাখীবন্ধন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে, যেখানে স্বয়ংসেবকরা বিভিন্ন সামাজিক স্তরের মানুষের হাতে রাখী বেঁধে সৌভ্রাতৃত্বের বার্তা দেন। সংগঠনের দাবি, এই ধরনের উদ্যোগ জাতপাতের প্রাচীন প্রাচীর ভাঙতে এবং সমাজে সাম্যের বোধ ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করছে।
২০৪৭-এর ভারত: সাংস্কৃতিক ঐক্যের ভূমিকা
স্বাধীনতার শতবর্ষ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় সরকার ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’ নামে যে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় লক্ষ্য স্থির করেছে, তার ঘোষিত ভিত্তিগুলির অন্যতম হল সামাজিক সংহতি ও জাতীয় ঐক্য। নীতি আয়োগ প্রকাশিত রূপরেখাতেও বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি ১৪০ কোটি নাগরিকের মধ্যে একটি অভিন্ন জাতীয় লক্ষ্যবোধ তৈরি করাও এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এই প্রেক্ষাপটে রাখী বন্ধনের মতো উৎসব, যা যুগে যুগে ধর্ম-জাতি-ভাষার বেড়া ডিঙিয়ে মানুষকে একসূত্রে বেঁধেছে, তাকে অনেক পর্যবেক্ষকই ভারতের বৃহত্তর সামাজিক পুঁজির অংশ হিসেবে দেখেন। তাঁদের যুক্তি, উন্নয়নের লক্ষ্যপূরণে নীতি বা বিনিয়োগের পাশাপাশি নাগরিকদের পারস্পরিক আস্থা ও সংহতিও সমান জরুরি, আর সেই আস্থা গড়ে তোলার কাজে রাখি বন্ধনের মতো সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রথার একটি ভূমিকা থাকতে পারে বলে তাঁদের অভিমত।
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ: সুতোর সমাজতত্ত্ব
সমাজবিজ্ঞানীদের একাংশের ব্যাখ্যা, যে কোনও সমাজেই প্রতীকী আচার-অনুষ্ঠান সামাজিক সংহতি গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়, কারণ প্রতীক মানুষকে এক অভিন্ন আবেগ ও অভিজ্ঞতার সূত্রে বাঁধে, যা শুধু আইন বা নীতি দিয়ে অর্জন করা কঠিন। রাখী বন্ধনও ঠিক সেই কাজ করে বলে তাঁদের অভিমত।
ইতিহাসবিদদের অনেকে অবশ্য মনে করিয়ে দেন, রাখী বন্ধনের সামাজিক ব্যবহারের ইতিহাস বহুস্তরীয় ও বিচিত্র, কখনও তা রাজনৈতিক সংহতির হাতিয়ার হয়েছে (তিলক, রবীন্দ্রনাথ), কখনও থেকে গিয়েছে পারিবারিক-ধর্মীয় আচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, আবার কখনও হয়ে উঠেছে সাংগঠনিক কর্মসূচির অংশ। ফলে এই উৎসবকে কোনও একরৈখিক ব্যাখ্যায় বেঁধে ফেলা মুশকিল, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অর্থ বারবার পুনর্নির্মিত হয়েছে।
মণিবন্ধ নয়, মনোবন্ধেই রাখির প্রকৃত সার্থকতা
বেদের যজ্ঞবেদী থেকে আজকের ভারত, রাখী বন্ধনের যাত্রাপথ বদলেছে বারবার, বদলেছে তার প্রকাশভঙ্গিও। কিন্তু একটি সুতো যে নিছক কব্জিতে বাঁধা কোনও বস্তু নয়, বরং বিশ্বাস, প্রতিশ্রুতি আর ভালবাসার প্রতীক, এই সত্য আজও অপরিবর্তিত। রাখি বন্ধন তাই মণিবন্ধে নয়, প্রকৃত অর্থে মনোবন্ধেই তার সার্থকতা খুঁজে পায়, আর সেই কারণেই যুগ যুগ ধরে বিভাজনের বিরুদ্ধে ঐক্যের প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকে এই উৎসব।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
