তারকেশ্বর, হুগলি : কৃষিনির্ভর বাংলার অন্যতম অঞ্চল তারকেশ্বরে, এদিন হাজার হাজার কৃষকের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক ও জৈব কৃষির দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। ভারতের কৃষিনীতি কি এক ঐতিহাসিক মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে ? পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষে তারকেশ্বরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণ সেই প্রশ্নই নতুন করে উত্থাপন করেছে।
হাজার হাজার কৃষকের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন—”মাটি বাঁচাতে হলে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে।” একই মঞ্চ থেকে তিনি “ন্যাশনাল মিশন অন ন্যাচারাল ফার্মিং”-এর সূচনা করেন এবং কৃষকদের প্রাকৃতিক কৃষি গ্রহণের আহ্বান জানান।
তিনি শুধু আহ্বানেই থেমে থাকেননি; জাতীয় স্তরে ‘ন্যাশনাল মিশন অন ন্যাচারাল ফার্মিং’-এর সূচনা, পিএম-কিষাণ প্রকল্পের নতুন কিস্তি বিতরণ এবং কৃষি পরিষেবাকে ডিজিটাল করার জন্য ‘অ্যাগ্রিস্ট্যাক’-এর উদ্বোধন করেন।
বর্তমানে ভারত একদিকে ক্রমবর্ধমান সার আমদানি ব্যয়, অন্যদিকে মাটির উর্বরতা হ্রাস—এই দুই সংকটের মুখোমুখি। তাই তারকেশ্বরের এই বার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ভারতের সামনে দ্বৈত সংকট
একদিকে অর্থনৈতিক চাপ
ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রাসায়নিক সার আমদানিকারক দেশ।
| সূচক | পরিসংখ্যান |
|---|---|
| ২০২৬ সালে সম্ভাব্য সার আমদানি | ২১–২২.৩ মিলিয়ন টন |
| ২০২৫ সালে আমদানি | ১৬ মিলিয়ন টন |
| ইউরিয়ার আন্তর্জাতিক মূল্য | ৯৫০ ডলার/টন |
| ডিএপি মূল্য | ৯০০ ডলার/টন |
| সম্ভাব্য সার ভর্তুকি | ₹৩.৪ লক্ষ কোটি |
| কেন্দ্রীয় বাজেটে মূল বরাদ্দ | ₹১.৭১ লক্ষ কোটি |
সরকার কৃষকদের সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির পুরো চাপ নিজের কাঁধে নিচ্ছে। ফলে ভর্তুকির বোঝা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
অন্যদিকে মাটির মৃত্যু
কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, ভারতের বহু কৃষিজমিতে Soil Organic Carbon ০.৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। স্বাস্থ্যকর মাটিতে যেখানে ১–২ শতাংশ জৈব কার্বন থাকা উচিত, সেখানে অধিকাংশ অঞ্চলে তা অর্ধেকেরও কম।
এর ফলে কী হচ্ছে?
- মাটির জীবন্ত অণুজীব ধ্বংস হচ্ছে
- কেঁচোর সংখ্যা কমছে
- জলধারণ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে
- ফলনের জন্য আরও বেশি রাসায়নিক সার লাগছে
- কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ছে
বিশেষজ্ঞরা এটিকে “মাটির আইসিইউ অবস্থা” বলে বর্ণনা করছেন।
সবচেয়ে বড় বিপদ: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য
প্রধানমন্ত্রীর প্রাকৃতিক কৃষির আহ্বানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খাদ্য ও জনস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ। কৃষি বিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের ব্যবহার শুধু মাটির ক্ষতি করছে না, ধীরে ধীরে মানুষের শরীরেও তার প্রভাব পড়ছে।
খাদ্যশৃঙ্খলে রাসায়নিকের প্রবেশ
যখন জমিতে অতিরিক্ত ইউরিয়া, ফসফেট এবং অন্যান্য রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়, তখন তার একটি অংশ উদ্ভিদের মাধ্যমে খাদ্যশস্যে প্রবেশ করে।
অবশিষ্ট অংশ –
- ভূগর্ভস্থ জলে মিশে যায়
- নদী ও পুকুর দূষিত করে
- পানীয় জলের গুণমান নষ্ট করে
ফলে দূষণ শুধু জমিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা মানুষের খাদ্য ও পানীয় জলের অংশ হয়ে যায়।
শিশুদের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি
জনস্বাস্থ্য গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মাত্রার নাইট্রেটযুক্ত পানি ও খাদ্য গ্রহণের ফলে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সম্ভাব্য প্রভাব
| স্বাস্থ্য ঝুঁকি | সম্ভাব্য প্রভাব |
| নাইট্রেট দূষণ | শিশুদের রক্তে অক্সিজেন পরিবহণে সমস্যা |
| ভারী ধাতুর উপস্থিতি | স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি |
| রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ | হরমোনজনিত সমস্যা |
| দীর্ঘমেয়াদি দূষণ | কিডনি ও লিভারের উপর চাপ |
| খাদ্যমানের অবনতি | রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস |
বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের কৃষিনীতির প্রভাব আগামী ২০-৩০ বছর ধরে শিশুদের স্বাস্থ্য নির্ধারণ করবে।
কেন প্রাকৃতিক কৃষি নিয়ে এত গুরুত্ব ?
প্রাকৃতিক কৃষির মূল দর্শন হলো –
“মাটি জীবিত থাকলে কৃষিও জীবিত থাকবে।”
এই পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয় –
- গোবর সার
- ভার্মি কম্পোস্ট
- জৈব তরল সার
- জীবাণু সার
- ফসলের অবশিষ্টাংশ
- দেশীয় কৃষি পদ্ধতি
মাটির স্বাস্থ্য বনাম রাসায়নিক কৃষি
| বিষয় | রাসায়নিক কৃষি | প্রাকৃতিক কৃষি |
| মাটির জৈব পদার্থ | কমায় | বাড়ায় |
| জলধারণ ক্ষমতা | কমে | বৃদ্ধি পায় |
| অণুজীব | ধ্বংস হয় | বৃদ্ধি পায় |
| দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতা | কমে যায় | উন্নত হয় |
| উৎপাদন ব্যয় | ক্রমাগত বাড়ে | ধীরে ধীরে কমে |
| পরিবেশগত প্রভাব | নেতিবাচক | ইতিবাচক |
কৃষকদের সাড়া: বদলের ইঙ্গিত
কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী চলতি খরিফ মরসুমে কৃষকরা ১১.১৭ লক্ষ টন জৈব সার কিনেছেন। এটি গত বছরের তুলনায় ৩.৫ গুণ বেশি। এ থেকে স্পষ্ট যে কৃষক সমাজের একটি বড় অংশ বিকল্প কৃষি ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে।
সরকারের কৌশল
১. ন্যাশনাল মিশন অন ন্যাচারাল ফার্মিং
- রাসায়নিকমুক্ত কৃষির সম্প্রসারণ
- কৃষক প্রশিক্ষণ
- প্রদর্শনী খামার
২. পিএম-প্রণাম
যেসব রাজ্য রাসায়নিক সার কম ব্যবহার করবে, তারা অতিরিক্ত আর্থিক প্রণোদনা পাবে।
৩. অ্যাগ্রিস্ট্যাক
- ডিজিটাল কৃষি পরিচয়
- সার বিতরণে স্বচ্ছতা
- সরকারি সুবিধা দ্রুত প্রদান
৪. দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তি
- সৌদি আরব
- রাশিয়া
- মরক্কো
থেকে স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মত
ভারত যদি রাসায়নিক সারের ব্যবহার মাত্র ১০-১৫ শতাংশ কমাতে পারে, তাহলে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি সাশ্রয় সম্ভব।
মৃত্তিকা বিজ্ঞানীদের মত
রাসায়নিক সার পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে সুষম ব্যবহার এবং জৈব উপাদানের সংযোজনই ভবিষ্যতের পথ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মত
বর্তমান কৃষি ব্যবস্থা শুধুমাত্র খাদ্যের পরিমাণ বাড়ানোর দিকে নজর দিয়েছে। আগামী দশকে খাদ্যের গুণমান এবং স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
পশ্চিমবঙ্গের জন্য এর গুরুত্ব
গঙ্গা অববাহিকার উর্বর জমি, আলু, ধান, সবজি ও ফল উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গ দেশের অন্যতম প্রধান রাজ্য।
কিন্তু একই সঙ্গে এখানে –
- অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহার
- মাটির জৈব উপাদানের ঘাটতি
- ভূগর্ভস্থ জলের ওপর নির্ভরতা
ক্রমশ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। তারকেশ্বর থেকে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিলেন, তা পশ্চিমবঙ্গের কৃষির ভবিষ্যতের সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।
উপসংহার: কৃষি নয়, সভ্যতার প্রশ্ন
পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনের জন্যে আয়োজিত তারকেশ্বরের মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন,, তা কেবল কৃষকদের উদ্দেশে নয়; এটি ভারতের কৃষি অর্থনীতি, পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ রূপরেখা। সার আমদানির ওপর নির্ভরতা, বাড়তে থাকা ভর্তুকির চাপ এবং মাটির ক্রমাবনতি – এই তিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রাকৃতিক কৃষি আগামী দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হয়ে উঠতে পারে। ভারত এই পরিবর্তন কতটা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তার ওপর নির্ভর করবে দেশের কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।
এটি ছিল ভারতের কৃষি মডেল নিয়ে এক মৌলিক প্রশ্নের সূচনা – আমরা কি শুধু বেশি খাদ্য উৎপাদন চাই, নাকি সুস্থ মাটি, নিরাপদ খাদ্য, সুস্থ মানুষ এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎও চাই ? ৩.৪ লক্ষ কোটি টাকার ভর্তুকি, বাড়তে থাকা আমদানি নির্ভরতা, মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং শিশুদের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য – সবকিছু মিলিয়ে প্রাকৃতিক কৃষির প্রশ্ন এখন আর শুধু কৃষকদের বিষয় নয়। এটি ভারতের অর্থনীতি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং আগামী প্রজন্মের অস্তিত্বের প্রশ্ন। সম্ভবত সেই কারণেই তারকেশ্বর থেকে উচ্চারিত প্রধানমন্ত্রী মোদির বার্তা আগামী দশকের কৃষিনীতি নির্ধারণে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
About The Author
Discover more from Jist Feed
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
