Baruipur_air pollutionনিজস্ব চিত্র

বারুইপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদাব্রত ঘাটে দাঁড়ালেই সামনে চোখে পড়ে আদি গঙ্গা—শ্রীচৈতন্যের পদধূলি সমৃদ্ধ এই সদাব্রতঘাট। এখানে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে বয়ে চলেছে মা গঙ্গা । এক সময় যার জলধারা জীবন দিত, আজ তার পাশেই ছড়িয়ে পড়ছে মৃত্যুর বিষ। বাম দিকে তাকালেই চোখে পড়বে সেচ দপ্তরের ফলক, তাতে লেখা আছে আদি গঙ্গার বাম তীরে কৃষ্ণমোহন পর্যন্ত সৌন্দর্যায়নের বিজ্ঞাপন। কিন্তু বাস্তবে সেই সৌন্দর্য আজ বিষাক্ত ধোঁয়া আর জঞ্জালের আড়ালে হারিয়ে গেছে।

বাঁ হাতের পিচ ওঠা রাস্তা ধরে আর একটু এগিয়ে গেলেই কীর্তন খোলা। কিছুটা এগোলেই কেন্দ্রীয় সরকারের “বিবেকানন্দ আরবান হোমলেস” প্রকল্পের আশ্রয়স্থল—যেখানে প্রায় ৪০ জন আশ্রয়হীন, বেশিরভাগই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, বেঁচে থাকার শেষ লড়াই লড়ছেন। দক্ষিণ দিক থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস একসময় স্বস্তি দিত, কিন্তু এখন সেই বাতাসই বয়ে আনছে দমবন্ধ করা বিষ। বাইরে তাকালে আকাশ কুয়াশার মতো ধোঁয়ায় ঢাকা।

ঠিক সামনেই ময়লা পোতা—বারুইপুর শহরের সমস্ত জঞ্জাল এখানে ডাম্প করা হয়। তারপর নিয়মিতভাবে, কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই, সেই জঞ্জালে আগুন ধরানো হয়। একবার আগুন লাগলে বেশ কয়েকদিন তা জ্বলতে থাকে, আর সেই আগুন থেকে বের হওয়া বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে চারদিকের জনপদ। যে মরসুমে যে দিকে হওয়ার অভিমুখ থাকে, সেই দিকে ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়া —অজান্তেই মানুষ শ্বাস নিচ্ছে মৃত্যুর। অনেক মানুষএর ধোঁয়ায় স্বাস নিতে অসুবিধা হলেও, ধোঁয়ার উৎস তাদের কাছে অজানা।

ধোঁয়ার রেডিয়াস এর মধ্যে আছে বিস্তীর্ণ জনপদ , বেশ কয়েকটি স্কুল ও সরকারি দপ্তর

ফুলতলা, পালপাড়া, বিশালক্ষীতলা, বৈদ্যপাড়া, সাহাপাড়া, হাইস্কুল এলাকা, শাসন, শিখরবালি—বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে মানুষ প্রতিদিন ধীরে ধীরে বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছে। শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, অসুস্থতা—এগুলো এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। আরও ভয়ঙ্কর বিষয়—এই বিষাক্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে একাধিক স্কুল: রানা বেলিয়াঘাটা হাই স্কুল, দক্ষিণ শাসন প্রাইমারি স্কুল, শিশু শিক্ষা সদন, জগদীশ চন্দ্র স্কুল, বিশালাক্ষী বিদ্যামন্দির, বারুইপুর গার্লস ও বারুইপুর হাই স্কুল। প্রতিদিন অসংখ্য ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, কর্মচারী এই বিষাক্ত পরিবেশে প্রবেশ করতে বাধ্য হচ্ছে।

দখিনা বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসছে ধোঁয়া
জঞ্জালে ঢেকেছে রাস্তা ও গঙ্গাতীরের সৌন্দর্যায়ন

সরকারি অফিস, গ্রাম পঞ্চায়েত, বিডিও অফিস—সবই এই ধোঁয়ার নাগালে। অথচ প্রশাসনের নীরবতা আজ প্রশ্ন তুলছে—মানুষের জীবনের কোনো মূল্য কি আর অবশিষ্ট আছে ?

বছরের পর বছর ধরে এই অবৈজ্ঞানিক, বিপজ্জনক প্রথা চলেই যাচ্ছে। ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থেকেও একটি আধুনিক, বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারেনি সরকার। বিদ্রূপের বিষয়, এই এলাকা বারুইপুর পশ্চিম বিধানসভার মধ্যে পড়ে, খোদ বিধানসভার স্পিকারের অধীনস্থ। তবুও সাধারণ মানুষকে শুদ্ধ বাতাসের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে নির্দয়ভাবে।

এটা শুধু অব্যবস্থা নয়—এটা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর আক্রমণ। এটা ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার এক নির্মম প্রক্রিয়া। প্রশ্ন একটাই—আর কতদিন এই বিষাক্ত নরকযন্ত্রণা সহ্য করবে বারুইপুরবাসী ? বেঁচে থাকবার জন্যে একটু মুক্ত বাতাস মানুষের ভাগ্যে জুটবে না ?

About The Author


Discover more from Jist Feed

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

You missed